সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরে
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩০ পিএম
বিপুল অঞ্চলজুড়ে সরিষার আবাদ, সিরাজগঞ্জ।
মরুভূমির ধূধূ বালুকারাশির কথা সাহিত্যে উঠে আসলেও সবুজের বুকে হলুদ ফুলের চোখজুড়ানো সরিষা ফুলের কথা হয়ত উঠে আসেনি। না উঠে আসার কারণও নিশ্চয় আছে। কেননা এত বিপুল অঞ্চলজুড়ে সরিষার আবাদ অন্য কোন অঞ্চলে হয় না যা হয় সিরাজগঞ্জ-পাবনা ও নাটোরের চলনবিলে। যেদিকেই চোখ যায় শুধু সরিষা আর সরিষা। সবুজ সরিষা ফুলে রোদে আভা পড়ে এক অপার সৌন্দর্য ধরা পড়ে। তাইতো পর্যটকরা ছুটে চলে সর্ষে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
শুধু সৌন্দর্যই দেশে সয়াবিনের একক আধিপত্য কমাতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে সরিষা চাষ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার (প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল এন্ড রূরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলেন্স ইন বাংলাদেশ) প্রকল্পের সহযোগিতায় সিরাজগঞ্জে বারি-২০ সরিষার আবাদ নতুন করে পথ দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরিষা চাষে গুরুত্বারোপ করলে তেল আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
কী বলছেন চাষিরা
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ
ইউনিয়নের পূর্ব মোহনপুর গ্রামের আব্দুল আওয়ালসহ ৩৫ জন কৃষকের ১০০ একর জমিতে বারি-২০
সরিষা চাষাবাদ করা হয়েছে। জানতে চাইলে আব্দুল আওয়াল বলেন, এবছর ভালো ফলন হলে আগামীতে
এটি আবার বোপন করবো। যাতে কৃষকরা লাভবান হয়। আমরা সাধারণত বারি-১৭ জাতের সরিষা আবাদ
করতাম। এভচর নতুন জাত এসেছে। বলা হচ্ছে এটি ফলন বেশি হবে ও তেলের পরিমাণও বেশি পাওয়া
যাবে।
তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে সরিষা
আবাদ করেছেন বলে জানান। আব্দুল আউয়াল বলেন, সরিষার মৌসুমে ২৫০০-২৮০০ টাকা মণে বিক্রি
করা যায়। তা ছাড়া মৌসুম পরবর্তী সময়ে ৩০০০-৩৫০০ টাকা মণেও বিক্রি হয়।
দেশে তেলের চাহিদা কত ও সরিষার
উৎপাদন কত
বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশনের
তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৩–২৪ লাখ টন। সে
হিসাবে ভোজ্যতেলের মাসিক চাহিদা দাঁড়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টনের মত।
সেখানে সয়াবিন তেলের গড় চাহিদা ৭৯ থেকে ৮৭ হাজার টন।
অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের
তথ্যমতে, ২০২৪ অর্থবছরে দেশে ১২ লাখ হেক্টর জমিতে ১৭ লাখ ৪৪ হাজার টন সরিষা উৎপাদনের
লক্ষ্যমাত্রার স্থলে ১০ লাখ ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টন সরিষা উৎপাদন
হয়েছে। তার আগের অর্থবছর দেশে ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা উৎপাদন হয় ১১ লাখ
৬৩ হাজার টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬ লাখ ৮৩ হাজার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭ লাখ ৫০ হাজার, ২০২০-২১
অর্থবছরে ৭ লাখ ৮৭ হাজার ও ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৫৪ হাজার টন। ২০১৭-১৮
অর্থবছরে দেশে সরিষা উৎপাদন ছিল ৬ লাখ ৫ হাজার টন।
কৃষি কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ
অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, ‘বাংলাদেশে সিরাজগঞ্জ জেলার পরিচিতি
একক ফসল হিসেবে সরিষা। আমরা চাই এই জেলা সরিষা চাষ আরো এগিয়ে যাক। তারই ধারাবাহিকতায়
বারি উদ্ভাবিত নতুন জাত বারি সরিষা-২০ এক জায়গায় ১০০ বিঘা জমিতে চাষ করা হয়েছে। প্রচলিতভাবে
বারি সরিষা-১৪, ১৫ ও ১৭ অধিক জনপ্রিয়, সেগুলোতে প্রতি বিঘায় গড়ে চার থেকে পাঁচ মণ ও
সর্বোচ্চ ৬ মণ ফলন হয়। বারি সরিষা-২০-এর ফলন বেশি, যা ৭ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত প্রত্যাশা
করছি। বারি-২০ এর জীবনকাল বারি-১৪ ও ১৭-এর কাছাকাছি হলেও এর আলাদা কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে।
যেমন- এ জাত খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল, যা চরাঞ্চলের জন্য বড় সুবিধা। এজন্য বারি-১৪,
১৫ ও ১৭ সঙ্গে বারি-২০ জাতটিও ছড়িয়ে দিতে চাই।
মনজুরে মাওলা আরো বলেন, আমাদের
লক্ষ্য হচ্ছে- রোপা আমন কাটার পর যে সময়টায় জমি পতিত থাকে সেইসময়ে সরিষার আবাদ করা।
সরিষার চাষকে আরো সমৃদ্ধ করতে চাই এবং পরবর্তীতে নির্বিঘ্নে বোরো ফসলের আবাদ করা নিশ্চিত
করতে চাই। এক জমিতে আমরা যদি তিনটি ফসল আবাদ করতে পারি, তাহলে কৃষি আরো সমৃদ্ধ হবে।
একেএম মনজুরে মওলা বলেন, সিরাজগঞ্জের বন্যা ও ভাঙন প্রবণ এলাকায় দুটি ধানের মাঝখানে
বারি-২০ সরিষার জাত আনতে পারলে সরিষার ফলন যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি তেলজাতীয় ফসলের ঘাটতিও
পূরণ হবে। সিরাজ ৯০ হাজার হেক্টর, অর্জিত হয়েছে ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর। গত বছর এই আবাদ
ছিল ৮৭ হাজার হেক্টর। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে এবার জেলায় এক লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক
টন সরিষা উৎপাদন হতে পারে।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা
সুবর্ণা ইয়াসমিন সীমা বলেন, একক উপজেলা হিসেবে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সবচেয়ে বেশি
সরিষা উৎপাদন হয়। তিনি জানান, সরিষার নতুন নতুন জাত সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ট্রাডিশনাল
ও লোকাল জাতের পাশাপাশি বারি ১৪, ১৫, ১৭ এবং নতুন বারি সরিষা-২০ জাতের চাষ বাড়ছে। পার্টনার
প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় তিনটি প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ট্র্যাডিশনাল জাতের
স্থলে আমরা উন্নত জাতের সরিষা প্রতিস্থাপন করেছি। তা ছাড়া কৃষি প্রণোদনার আওতায় প্রায়
১৬ হাজার কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ
অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) জেরিন আহমেদ বলেন, ২০২০ অর্থবছরে কৃষকদের মধ্যেসাড়ে
১২ হাজার টন বীজ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি বীজের দাম ছিল ৭৫-৭৮ টাকা। ২০২১ অর্থবছরে
৮০-৮২ টাকা কেজি দরে ১৫ হাজার টন, ২০২২ অর্থবছরে ৮০-৮২ টাকা কেজি দরে ৩৫ হাজার ২০০
কেজি, ২০২৩ অর্থবছরে ৮০-৮২ টাকা কেজি দরে ৪১ হাজার ২০০, ২০২৪ অর্থবছরে ৮২-৮৫ টাকা কেজি
দরে ৭১ হাজার ও ২০২৫ অর্থবছরে ৮৩-৮৫ টাকা কেজি দরে ৭৩ হাজার কেজি বীজ বিতরণ করা হয়েছে।
তা ছাড়া প্রতি বিঘা জমির জন্য ১০ কেজি ডিওপি ও ১০ কেজি এমওপি সার বিনামূল্যে দেওয়া
হয়েছে।
সরিষা চাষাবাদের ফলে জমিতে প্রায়
অর্ধেক রাসায়নিক সার কম লাগে
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের
(বারি) সরেজমিন গবেষণা বিভাগের পাবনা কার্যালয়ের সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার
সিরাজুল ইসলাম বলেন, পার্টনার প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে পতিত জমিকে আবাদের আওতায়
নিয়ে আসা, সেটি মৌসুমি পতিত বা এমনিতে পতিত হোক। সেই জমিটা ফসলের আওতায় নিয়ে এসে কৃষকের
চিরাচরিত ফসলে বিঘ্ন না ঘটিয়ে দুটি ফসলের মাঝখানের পতিত সময়কে কাজে লাগানো। বর্তমানে
আমরা বারি সরিষা-২০ এর উচ্চফলনশীল জাত বপন করেছি। এ জাত ৭৫-৮০ দিনের মধ্যে কাটা যায়।
অর্থাৎ ১০ নভেম্বরের মধ্যে বোনা হয় এবং জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে তা কেটে কেটে ফেলা হয়।
তখন কৃষক বোরো ধান রোপণ করতে পারবে। এ সময়ে চাষাবাদের কারণে একদিকে কৃষক বাড়তি আয়ে
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভবান হবে। বিঘাপ্রতি এসবের ফলন ৬-৭ মণ তবে এ অঞ্চলে তা ৫-৬ মণ
হবে। আর মাটির স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন ঘটবে।
তিনি বলেন, সরিষা গাছের নিচে এক
প্রকার হিউমাস তৈরি হয়। হিউমাসের ফলে নাইট্রোজেন ধরে রাখে। নাইট্রোজেন সাধারণত কার্বন
ডাই অক্সাইড হয়ে বাতাসে উড়ে যায়। কৃষক জমিতে যে ইউরিয়া সার ব্যবহার করে সেখানে এই নাইট্রোজেনের
কাজ করে। সরিষাগাছ শিকড় বা গিটের মাধ্যমে নাইট্রোজেন ধরে রাখে। এতে করে মাটির উর্বরতা
বৃদ্ধি পায়। ফলে পরবর্তী ফসলে জমিতে প্রায় অর্ধেক সার কম লাগে। তা ছাড়া বারি সরিষা-২০
একটি স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল জাত। যমুনা নদীর চরে পার্টনার প্রকল্পের (বারি অঙ্গ)
আওতায় এটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। পাইলট প্রডাকশন হিসেবে ১০০ বিঘা জমিতে কৃষকদের সার, বীজ
ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া হয়েছে। এক মণ সরিষায় ১৪-১৫ লিটার তেল হতে
পারে। সেখানে আগের সাধারণ জাতের সরিষায় এক মণে ৮-১০ লিটার তেল হয়।
তিনি বলেন, বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ
হয় ৮-১০ হাজার টাকা। ন্যূনতম ৬ মণ সরিষা পেলেও সাড়ে তিন হাজার টাকা করে প্রায় ২০ হাজার
টাকা বিক্রি করা যাবে। তারপর গাছের উচ্ছিষ্ট অংশটুকুকে ৩-৫ হাজার টাকার জ্বালানি আসে।
এতে জ্বালানিও সাশ্রয় হচ্ছে। তা ছাড়া জমির উর্বরতা রয়েছেই।
ভোজ্যতেল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা
সাশ্রয় প্রধান লক্ষ্য
পার্টনার (প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল
এন্ড রূরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলেন্স ইন বাংলাদেশ)
প্রকল্পের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশে বছরে ২৪-২৫ লাখ
মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। তার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। আমাদের তেল
জাতিয় ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের উৎপাদন ৪০ শতাংশ হ্রাসের একটি প্রকল্প কাজ করছে।
পাশাপাশি পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমেও আমরা কিছু সরিষার প্রদর্শনী দিচ্ছি। এতে করে
সয়াবিন আমদানি কমবে। গত অর্থবছরে সরিষাসহ অন্যান্য তেল জাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে
তেল আমদানি ৬ হাজার কোটি টাকা বেঁচে গেছে।
তা ছাড়া সয়াবিনে স্বাস্থ্যগত কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে সেখানে সরিষা সম্পূর্ণ
নিরাপদ। তাই সরিষা আবাদে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ আব্দুর রহিম বলেন, আমাদের দেশে ভোজ্যতেলের ৯০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। প্রথমত আমরা উন্নত জাতের সরিষা আবাদের মাধ্যমে সেই আমদানি নির্ভরতা কমাতে চাই। কেননা এতে প্রচুর অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে এপি রোধ করা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে- দেশে এখন ভালো ভালো ও উন্নত সরিষার জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। এগুলোকে মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করা। এসবের মধ্যে বারি সরিষা-১৮, এটি হার্ট ফ্রেন্ডলি তেল হয়। এসব জনসাধারনের মাছে অভ্যস্ত করা। যাতে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে তেলের আমদানি রোধ হয়। আর আমরা সবসময় আমদানিকে নিরুসাহিত করে থাকি। বরং রপ্তানিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।