ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:২৪ পিএম
লোকালয় থেকে বন্যপ্রাণী উদ্ধার
মৌলভীবাজারের বিভিন্ন সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চল থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। প্রাণীদের আবাসস্থল আশঙ্কাজনক কমে যাওয়া, বনাঞ্চলের আয়তন হ্রাস এবং প্রাণীদের খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একসময়ে লোকালয়ে আসা এসব বন্যপ্রাণীগুলোকে আতঙ্কিত হয়ে মেরে ফেলত স্থানীয়রা। তবে মানুষের মাঝে বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এখন মানুষ লোকালয়ে বন্যপ্রাণী দেখলে খবর দিচ্ছেন বন বিভাগসহ বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণে কাজ করছে এমন সংগঠনগুলোকে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত জেলার শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী রেঞ্জ এবং বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মীরা লোকালয় থেকে উদ্ধার করেছে মোট ১৩৮টি বন্যপ্রাণী ও পাখি। উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণী ও পাখিগুলোকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাইল হাওরসহ নানা বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে। ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের আপন ঠিকানায়।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ২টি তক্ষক, ৩টি গন্ধগোকুল, ২টি লজ্জাবতী বানর, ২টি অজগর সাপ, ৩টি ঘুঘু, ৩টি বানর, ৮টি ময়না, ৩৩টি গো শালিক, ৫টি শালিক, ৩টি টিয়া, ১টি চিত্রা হরিণ, ১টি ঈগল, ১টি ভুবন চিল, ১টি ব্রাউন পেঁচা, ১টি পদ্মগোখরা সাপ, ১টি গোমাধিক ও ১টি নিশিবক লোকালয়ের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন লোকালয়ের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করেছে ৬৭টি বন্যপ্রাণী। তাদের হাতে উদ্ধার হওয়া বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রয়েছে ২৩টি অজগর সাপ, ৯টি লজ্জাবতী বানর, ৬টি গন্ধগোকুল, ৪টি বনবিড়াল, ৪টি শঙ্খচিল, ৩টি বেত আঁচড়া সাপ, ২টি দাঁড়াশ সাপ ও ২টি সবুজ ফনিমনসা সাপ, ১টি বেজি, ১টি লহ্মীপেঁচা, ১টি নীলকণ্ঠ পাখি, ১টি ঘরগিন্নী সাপ, ১টি ভুবন চিল, ১টি সবুজ বোরাল সাপ, ১টি সোনা গুঁইসাপ, ১টি সুন্ধি কচ্ছপ, ১টি জুনিয়া সাপ, ১টি পদ্মগোখরা সাপ, ১টি শিয়াল, ১টি উল্টা লেজি সিংহ বানর, ১টি জংলিপেঁচা ও ১টি ভোঁদড়। এর মধ্যে ২টি গন্ধগোকুল, ১টি বন বিড়াল, ২টি লজ্জাবতী বানর ও ১টি ভোঁদর। বনবিভাগের কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পর মৃত এসব প্রাণীদের মাটিচাপা দেয়া হয়।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, "২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের ১৮ তারিখ থেকে ডিসেম্বর মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন লোকালয় থেকে মোট ৬৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছি আমরা। লোকালয়ের কোথাও কোন বন্যপ্রাণীর দেখা গেলেই মানুষ আমাদের কাছে খবর পাঠান। আমরা সেগুলোকে উদ্ধার করে বন্যপ্রাণী রেঞ্জে হস্তান্তর করি। তারা প্রাণীগুলোকে পুনরায় বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দেন।
"বনাঞ্চলে নির্বিচারে গাছপালা ও ঝোপঝাড় উজাড়ের ফলে বন্যপ্রাণীরা তীব্র খাদ্য সংকটে নিপতিত। বনভূমিতে মানুষের অবাধ প্রবেশ, জঙ্গল কেটে ফসল চাষ, বসতবাড়ি স্থাপন এবং অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণের কারনে বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক আবাসস্থলে বসবাস করা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারনে বন্যপ্রাণীরা প্রতিনিয়তই বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে।"
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক বলেন, "এ এলাকায় আগের চেয়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন যখন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে তখন আমাদের কর্মীরা বা আমরাও সাথে থাকি। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই বিরল ও বিপন্নপ্রায় বন্যপ্রাণীকে বনে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে।"