খাগড়াছড়ি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:২২ পিএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:২৬ পিএম
পাহাড়ের প্রান্তিক নারীদের চোখে স্বপ্ন ফেরাতে, অসহায় মানুষের জীবনে স্বস্তির ছোঁয়া দিতেÑ ‘মাত্রা নারীর স্বস্তির যাত্রা’ এই মানবিক মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে সামাজিক সংগঠন ‘মাত্রা’ খাগড়াছড়িতে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর এলাকায় আয়োজিত
এক মানবিক কর্মসূচিতে অসচ্ছল নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের
মাঝে সেলাই মেশিন, হুইলচেয়ার, কোরআন শরিফ, চাল ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এসব সহায়তা সামগ্রী
বিতরণ করেন ‘মাত্রা’র প্রতিষ্ঠাতা ও গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর
ফেরদৌসী পারভিন। এ সময় নারী উদ্যোক্তা বীণা রাণী ত্রিপুরা, চামেলী ত্রিপুরাসহ স্থানীয়
গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিন অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করতে ৭টি সেলাই মেশিন, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার, মহিলা এতিম মাদ্রাসা ও নূরানী হাফেজি মাদ্রাসায় কোরআন শরীফ, হামাচাং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চম্পাঘাট শিশু সদনের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষাসামগ্রী, ইসলামপুর এতিমখানায় ১০০ কেজি চাল, সবুজ নূরানী মাদ্রাসায় সেলাই মেশিন, রসুলপুর এতিমখানা মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ড্রেস,বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ, বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন অসচ্ছল পরিবার ও নারীদের প্রয়োজনীয় উপকরণও প্রদান করা হয়।
বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রফেসর ফেরদৌসী পারভিন বলেন,‘পাহাড়ের নারীরা
কখনোই পিছিয়ে নয়, তারা পিছিয়ে থাকে কেবল সুযোগের অভাবে। আমি বিশ্বাস করি, সহানুভূতি
নয়; দক্ষতা ও উপকরণ দিলে একজন নারী নিজেই নিজের ভাগ্য গড়ে নিতে পারে।’
তিনি আরও বলেন,‘২০২১ সাল থেকে সেই বিশ্বাস থেকেই খাগড়াছড়িতে সম্পূর্ণ
বিনামূল্যে সেলাই মেশিন, কোমর তাঁতের সুতা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে আসছি। অনেক নারী
আছেন, যাদের হাতে কাজ আছে, কিন্তু পুঁজির অভাবে তারা উদ্যোক্তা হতে পারছেন না।’
পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন,‘থামি, রিনাই-রিসা,কারুকাজের
জন্য সুতা কিংবা সেলাইয়ের কাজ, এই পাহাড়ের নারীদের ঐতিহ্যই তাদের শক্তি। আমরা শুধু
সেই শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিচ্ছি ।’
অবসর জীবন প্রসঙ্গে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর আমার অবসর ভাতার প্রতিটি টাকা আমি পাহাড়ের অসহায় ও অসচ্ছল নারীদের জন্য ব্যয় করছি। এটি কোনো দান নয়, এটি আমার সামাজিক দায়িত্ব। যতদিন বেঁচে থাকব, এই মানবিক কাজ অব্যাহত থাকবে’ বলে তিদনি জানান।
তিনি জানান, ‘২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত খাগড়াছড়িতে প্রায় ১ হাজার
৭০০ জন অসচ্ছল নারী ও পরিবারের মাঝে বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। আজ এতিমখানা, মাদ্রাসা,
অনাথ আশ্রম ও প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমি গর্বিত।’
উপকারভোগীদের কণ্ঠে নতুন জীবনের গল্প:
সেলাই মেশিন পাওয়া এক নারী বলেন, ‘সেলাইয়ের কাজ জানতাম, কিন্তু
মেশিন কেনার সামর্থ্য ছিল না। আজ এই মেশিন পেয়ে মনে হচ্ছে নতুন করে জীবন শুরু করতে
পারব। নিজের আয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারব।’
আরেক উপকারভোগী নারী হাসিনা বেগম বলেন, ‘এই সেলাই মেশিন শুধু কাজের
উপকরণ নয়- এটা আমাদের আত্মবিশ্বাস।
এখন আর অন্যের ওপর নির্ভর করতে হবে না। নিজের পরিশ্রমেই সামনে এগিয়ে যেতে পারব।’
তবলছড়ি থেকে আসা উপকারভোগী নারী নিপু আক্তার বলেন, ‘আমাদের মতো
পাহাড়ের নারীদের কেউ সাধারণত খোঁজ নেয় না। আজ মনে হচ্ছে আমরা একা নই। এই সহায়তা আমাদের
জীবনে বড় পরিবর্তন আনবে।’
রসুলপুর এতিমখানা মহিলা মাদ্রাসার প্রতিনিধি শাহ নেওয়াজ বলেন,
‘শিক্ষাসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পেয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা ভীষণ আনন্দিত। এতে তাদের
পড়াশোনার আগ্রহ আরও বাড়বে।’
সেলাই মেশিন পেয়ে নূরানী হাফেজি মহিলা মাদ্রাসার প্রতিনিধি ফাতেমা
আক্তার বলেন, ‘এই সহায়তা আমাদের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এটি তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়ক হবে্।’
সমাজের জন্য অনুকরণীয় উদ্যোগ :
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলের
নারীদের স্বাবলম্বী করতে ‘মাত্রা’র এই উদ্যোগ কেবল সহানুভূতির প্রকাশ নয়, বরং টেকসই
উন্নয়নের একটি বাস্তব ও কার্যকর মডেল। তারা এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার
আহ্বান জানান।
মানবিকতা, স্বাবলম্বিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ‘মাত্রা’ আজ খাগড়াছড়ির অসহায় মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছেÑ যা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য অনুকরণীয়।