মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:১৯ পিএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:২৩ পিএম
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শুকুরের হাট ও তৎসংলগ্ন এলাকা এখন ভেজাল ও বিষাক্ত গুড় তৈরির অঘোষিত রাজধানী। উপজেলার গেনার পাড়া ও ফুলচৌকি খামারপাড়া গ্রামের ঘরে ঘরে চিনি ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে দেদারসে তৈরি হচ্ছে মরণঘাতী গুড়। আখের নামগন্ধহীন এসব কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে টেক্সটাইল-ডাই (কাপড়ের রং), মাথার সিদুর, চুন ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী মারাত্মক সব কেমিক্যাল।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ওই এলাকার গুড় তৈরির কারখানাগুলোতে আখের
কোনো অস্তিত্ব নেই। চিনির রসের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে পচা মিষ্টির শিরা এবং লিভার-কিডনি
ধ্বংসকারী বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক। অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদিত
এই বিষাক্ত মিশ্রণই পরে শক্ত হয়ে বাজারে যাচ্ছে খাঁটি আখের গুড় নামে। মূলত আসন্ন পবিত্র
রমজান মাসকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীদের এই অপতৎপরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, এই বিশাল ভেজাল কারবারের মূল নিয়ন্ত্রক মিল্লাত
ট্রেডার্স-এর মালিক মুকুল মিয়া। তিনি ওই এলাকার ক্ষুদ্র উৎপাদকদের কাছ থেকে নিয়মিত
চাঁদা তুলে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে মাসোয়ারা হিসেবে পৌঁছে দেন। এই অদৃশ্য শক্তির
প্রভাবেই বারবার অভিযান সত্ত্বেও কারখানাগুলো বন্ধ হচ্ছে না। বিএসটিআই-এর কোনো অনুমোদন
ছাড়াই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভুয়া চালান ব্যবহার করে এই গুড় ট্রাকযোগে পৌঁছে যাচ্ছে
উপজেলা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ওই এলাকায় বেশ কয়েকবার
অভিযান চালিয়ে কয়েক লাখ টাকা জরিমানা এবং প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট করেছে উপজেলা
প্রশাসন। তবে অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রটি।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন
এসে জরিমানা করে যায়, কিন্তু দুদিন পরই আবার আগের মতো গুড় বানানো শুরু হয়। আমাদের চোখের
সামনে মানুষকে বিষ খাওয়ানো হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
দুলাল নামে আরেকজন বলেন, শুধু সাময়িক জরিমানা করে এই মরণঘাতী ব্যবসা
বন্ধ করা সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এই চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার
জোর দাবি জানাচ্ছি এবং কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে সিলগালা করা হোক।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মিল্লাত ট্রেডার্সের মালিক মুকুল মিয়া
সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কোনো ভেজাল গুড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত নই, শুধু ব্যবসার
প্রয়োজনে অন্যদের কাছ থেকে গুড় সংগ্রহ করি। প্রশাসনের নামে টাকা তোলার বিষয়টি সম্পূর্ণ
মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এলাকার কিছু প্রতিপক্ষ আমার ব্যবসায়িক সুনাম নষ্ট করার জন্য এসব
অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার কাছে বৈধ কাগজপত্র ও চালান রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক (রোগনিয়ন্ত্রণ) এম এ হালিম
লাভলু বলেন, রাসায়নিক মিশ্রিত এই গুড় শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এটি দীর্ঘমেয়াদে
শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি অকেজো হওয়া থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী ক্যানসার পর্যন্ত হতে
পারে। তাছাড়াও রমজান মাসে খালি পেটে এই গুড় দিয়ে তৈরি শরবত বা খাবার খেলে তাৎক্ষণিক
অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে।
মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজ জানান,
আমি এ উপজেলায় নতুন যোগ দিয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খুব শিগগিরই
কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।