মাসউদুল আলম, ঝালকাঠি
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:৪৩ পিএম
আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:১৬ এএম
শরিফ ওসমান বিন হাদি
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাই নয়, এটি একটি চেতনা ও সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলে মনে করছেন তার সহযোদ্ধা, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তার মৃত্যুর পর ঝালকাঠির নলছিটি পৌর শহরের খাসমহল এলাকা পরিণত হয়েছে শোক, ক্ষোভ ও আর্তনাদের জনপদে।
নিঃশব্দ সরু পথের পাশে ছোট্ট একটি টিনের ঘর। কোনো অট্টালিকা নয়, নেই বিলাসিতাও। এই সাধারণ টিনের ঘর থেকেই উঠে এসেছিলেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতি এবং নতুন রাষ্ট্রচিন্তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ওসমান হাদি। ওই বাড়িতে আবেগজড়িত কণ্ঠে এলাকাবাসীকে বলতে শোনা যায়, বিপ্লবী অট্টালিকা থেকে আসে না, ওসমান হাদি উঠে এসেছিলেন এই টিনের ঘর থেকেই।

ওসমান হাদির মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই নলছিটির খাসমহল এলাকায় বৃহস্পতিবার রাত থেকেই তাঁর বাড়িতে ছুটে আসছেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সহপাঠী ও শুভানুধ্যায়ীরা। কান্না, আহাজারি আর নিস্তব্ধতায় পুরো এলাকা হয়ে ওঠে ভারী। অনেকেই বাকরুদ্ধ, কেউ কেউ আবার ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
নিরাপত্তাজনিত কারণে বৃহস্পতিবার রাতে ওসমান হাদির পরিবারের সদস্যরা কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ বা কথা বলেননি। পুলিশ জানিয়েছিল, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত রাখা হয়েছিল। শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) সকালে শুধু সংবাদকর্মীরা বাড়িতে ঢুকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ পান।
বর্তমানে বাড়িটিতে অবস্থান করছেন হাদির বোন মাছুমা সুলতানা বিনতে হাদি ও তাঁর ভগ্নিপতি আমির হোসেন। শোকাহত পরিবারটির পাশে থাকতে দূরদূরান্ত থেকে স্বজনেরা বাড়িতে জড়ো হচ্ছেন। জড়ো হচ্ছেন সামাজিক, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। দুপুরে বোন ও ভগ্নিপতি প্রিয় ভাইকে চিরবিদায় দেয়ার জন্য ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
ওসমান হাদির টিনের ঘরটি এখন কেবল একটি বসতঘর নয়, এটি হয়ে উঠেছে একটি রাজনৈতিক ভাষ্য। এই ঘর প্রমাণ করে দেয়, রাজনীতি কেবল বিত্ত ও ক্ষমতার বিষয় নয়, বরং আদর্শ, সাহস ও আত্মত্যাগের বিষয়। এখানে বেড়ে ওঠা ওসমান হাদি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, ইনসাফের কথা বলেছে বারবার।
শুক্রবার সকালে খাসমহল এলাকায় প্রতিবেশী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা দাবি জানান, ওসমান হাদির জীবনী পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় বীর’ স্বীকৃতি দিতে হবে।
তাদের মতে, ওসমান হাদির জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য একটি রাজনৈতিক পাঠ। তিনি শিখিয়েছেনÑ বিপ্লব মানে শুধু জীবন দেওয়া নয়, বরং নিজেকে তৈরি করা, যোগ্য হওয়া এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকা।
ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড নিছক ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ৫ আগস্টের পর গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি ছিলেন বিকল্প কণ্ঠস্বর। ইনকিলাব মঞ্চ ও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে তিনি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সমন্বয় ঘটান, যা প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারত। তিনি এমন রাজনীতি করছিলেন, যা দলীয় সীমানার বাইরে গিয়ে তরুণদের ভাবাতে শুরু করেছিল। এই জায়গাটাই তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
শরীফ ওসমান বিন হাদি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯৩ সালে। তার পিতা মরহুম মাওলানা আব্দুল হাদি। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ। বড় ভাই ড. মাওলানা মুফতি আবু বক্কর ছিদ্দিক বরিশাল বাঘিয়া আল আমিন কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং গুঠিয়া জামে মসজিদের খতিব। মেজ ভাই ওমর ফারুক ব্যবসায়ী।
ওসমান হাদির প্রতিবাদী চেতনা হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি। তার বাবা মরহুম মাওলানা আব্দুল হাদিও ছিলেন প্রতিবাদী মানুষ। অন্যায় ও অসত্যের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। শিক্ষকতা, ধর্মীয় দায়িত্ব আর সামাজিক ভূমিকার পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল তাঁর স্বভাব। ছিলেন নীরব প্রতিবাদী। কম কথা বলতেন, কাজে বেশি দেখাতেন। সেই আদর্শই ছোটবেলা থেকে হাদির ভেতরে গেঁথে দেন তিনি।
ওসমান হাদির ভগ্নিপতি আমির হোসেন বলেন, ওসমান হাদি একা কোনো ব্যক্তি ছিল না, সে ছিল একটি দর্শন, একটি চেতনার নাম। আজ আমরা যেসব নিরাপত্তা, পাহারা আর রাষ্ট্রীয় সমবেদনা দেখছি, এসব জীবিত ওসমানের জন্য প্রয়োজন ছিল। রাষ্ট্র যদি সময়মতো তাকে চিনতে পারত, তাহলে আজ ইতিহাস অন্যরকম হতো।
ঝালকাঠি-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করীম বলেন, ওসমান হাদির রাজনীতি ছিল নৈতিকতার, আপসহীন আদর্শের। তিনি দেখিয়েছেন, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, রাজনীতি মানে নৈতিক সাহস ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা যুগ্ম সমন্বয়ক মুফতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, এটি শুধু একজন মানুষ হত্যার ঘটনা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা। ওসমান হাদি এখন আর একজন মানুষের নাম নয়, লাখো কোটি মানুষের চেতনা।
স্থানীয় আলেম মাওলানা ওমর ফারুক আবু হানিফ বলেন, ওসমান হাদির মৃত্যু আমাদের দায় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তার অসমাপ্ত কাজ আমাদের শেষ করতেই হবে, অন্যথায় এই হত্যার দায় ইতিহাস আমাদের ঘাড়েই চাপাবে।
ওসমান হাদির বাবার ছাত্র মনজুরুল হাসান সজীব বলেন, বাবার আদর্শের বাস্তব রূপ ছিলেন ওসমান হাদি। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, মানুষ মরতে পারে, আদর্শ মরে না।
ওসমান হাদির প্রতিবেশী সাংবাদিক শরিফুল ইসলাম পলাশ বলেন, এই ছোট্ট টিনের ঘর থেকে উঠে আসা বিপ্লবীর মৃত্যু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। তিনি আমাদের দেখিয়ে গেছেন, সাহসের ঠিকানা বড় ঘর নয়, বড় মন আর দৃঢ় মেরুদণ্ড।