মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৭ পিএম
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:২৫ পিএম
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও নানা ধরনের প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে উপজেলা সদরসহ অন্তত ৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, আবদুর রাজ্জাক ২০২৪ সালের
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সাবেক সংসদ সদস্য
আলহাজ জাহাঙ্গীর আলম সরকারের পক্ষে ভোট কারচুপিতে সহায়তা করেন। এরপর ওই সাবেক এমপির
ঘনিষ্ঠতার সুযোগে তিনি একটি নির্দিষ্ট শিক্ষকচক্রকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যে
জড়িয়ে পড়েন।
শিক্ষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলার ২০৪টি সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে স্লিপ বরাদ্দ, ওয়াশ ব্লক, ক্ষুদ্র মেরামত, রুটিন মেইনটেন্যান্স ও জরুরি বরাদ্দের
অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে ক্লাস্টারভিত্তিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিয়মিত উৎকোচ আদায় করে
থাকেন। নির্ধারিত অর্থ না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষকদের হয়রানি করা হয়।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মবহির্ভূত বদলি বাণিজ্য, মৌখিক ডেপুটেশন, শূন্যপদ গোপন রেখে নিয়োগ ও পদায়নসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকরা আরও জানান, ডিপিএড প্রশিক্ষণে নাম অন্তর্ভুক্ত
করা, জিপিএস তহবিল থেকে অগ্রিম ঋণ উত্তোলন, নতুন সার্ভিসবুক খোলা, মেডিকেল ছুটি অনুমোদন,
পাসপোর্ট ও বিদেশ গমনের অনুমতি, হজ্জ ও উচ্চশিক্ষার ছুটি, বকেয়া বিল উত্তোলন, শোকজের
জবাব গ্রহণ, বৈশাখী ভাতা, পেনশন ফাইল, বাৎসরিক বেতন বিবরণী (এবিবি) প্রদান এবং বিদ্যালয়
পরিদর্শন- প্রায় সব অফিসিয়াল কাজেই ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না
দিলে প্রতি ধাপে ধাপে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে শিক্ষকদের।
বড়ইয়াকড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও
শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. জামাল হোসেন জানান, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা যোগদানের পরই
আওয়ামী লীগের ভোট কারচুপির নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে রাতারাতি পলাতক এমপি জাহাঙ্গীর
আলম সরকারের ঘনিষ্ঠজন হয়ে উঠেন এবং পরবর্তী সময়ে কয়েকজন আওয়ামী দোসর শিক্ষককে সঙ্গে
নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সরকারি সকল প্রকার বরাদ্দ, অফিসিয়াল ফাইল, ও বদলি, পদায়ন,
ডেপুটেশনসহ সকল ক্ষেত্রে ঘুষের রাজত্ব গড়ে তুলেন।
প্রধান শিক্ষক মোসা. জুয়েল বেগম, খাইরুন্নাহার, মাইন উদ্দিন ও খাদিজা বেগম জানান, তাদের কাছ থেকে সহকারী শিক্ষা অফিসার (এটিইও) হালিমা বেগম স্লিপ বরাদ্দের অর্থ চাপ সৃষ্টি করে নেন। এভাবেই উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবদুর রাজ্জাক তার প্রতিনিধির মাধ্যমে বিভিন্ন খাতসমূহ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন। এসব অনিয়মে উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। তারা দ্রুত ওই শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলেন, একজন শিক্ষা কর্মকর্তার এমন
অনিয়ম পুরো প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট করছে। তারা স্বচ্ছ ও স্বাধীন
তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির
দাবি জানান।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক প্রশ্ন করলে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষা খাতে অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য
নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাপস কুমার পাল বলেন, ‘এ ধরনের একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’