টেকনাফ সীমান্ত
মোহাম্মদ ইউনুছ অভি, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:০২ পিএম
আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:২২ পিএম
পাহাড়, নদী ও সমুদ্রঘেরা বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালান, মানব ও মাদক পাচারের প্রধান রুট হিসেবে চিহ্নিত। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১২ লাখ রোহিঙ্গা এসে আশ্রয় নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। তাছাড়া কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারে চলমান সংঘাতে দেশটিতে তীব্র খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছে। এই অস্থিরতার সুযোগে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মি। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট মোকাবিলায় তারা ক্রমেই বাংলাদেশের সীমান্তনির্ভর হয়ে পড়ছে এবং বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি দুষ্কৃতকারীদের নিজেদের কর্মকাণ্ডে যুক্ত করছে। মাছ ধরার ট্রলারের পাচারপথ ব্যবহার করে তারা খাদ্যদ্রব্য ও নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহের বিনিময়ে পাঠাচ্ছে মাদকের বড় বড় চালান।
প্রশাসনের কঠোর তৎপরতা এবং নিয়মিত অভিযান চলমান থাকলেও স্থানীয় দুষ্কৃতকারী, অসাধু কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় এসব মাদক দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, মাদককে কেন্দ্র করে টেকনাফে অপহরণ, ডাকাতি, খুন ও গুমের মতো গুরুতর অপরাধ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগÑ অধিকাংশ পাচারকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকায় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ না হয়ে বরং দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলেও জানান তারা।
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে পাচারচক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, রাত নামলেই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে সক্রিয় হয়ে ওঠে মাদক নেটওয়ার্ক। নাফ নদী, পাহাড়ি রুট ও জলপথ ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে নির্বিঘ্নে মাদক পাচার করা হচ্ছে। তারা জানান, স্থানীয় কিছু রাজনীতিবিদ পাচারচক্রকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। ফলে ছোট বাহক ধরা পড়লেও মূল হোতারা রাজনৈতিক সুরক্ষায় নিরাপদ থাকে, আর সাধারণ বাহকদের আটক দেখিয়ে অভিযান শেষ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, টেকনাফে মাদক সহজলভ্য হওয়ায় যুবসমাজ বিপথে যাচ্ছে এবং এ কারণে নানারকম অপরাধ বাড়ছে। ড্রোন নজরদারি, উন্নত স্ক্যানার বা আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় পাচারচক্রের গতিবিধি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক কিছু চক্র মাদক ও অস্ত্র পাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
যদিও স্থানীয় প্রশাসন বলছে, আইন প্রয়োগে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করা হয় না এবং অপরাধী যে-ই হোক না কেনÑ তাকে আইনের আওতায় আনা হয়, ভবিষ্যতেও হবে। বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় জনসাধারণের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, স্থানীয়রা তথ্য দিলে যেকোনো অভিযান আরও সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। ইতোমধ্যে সীমান্তে ড্রোন নজরদারি, থার্মাল ক্যামেরা এবং নদীপথে আধুনিক টহলব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যাতে পাচারকারীদের গতিবিধি রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
টেকনাফ ২-বিজিবি ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, গত ৬ মাসে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ২২ লাখ ৮২ হাজার ২৪২ পিস ইয়াবা, ৩৫ কেজি ৪৫ গ্রাম গাঁজা, ৭৯.৫ লিটার চোলাই মদ, ৮১৬ কেজি ক্রিস্টাল মেথসহ ৬৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আরও ৫১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চোরাচালান, মাদক ও মানব পাচার রোধে সীমান্তে দিন-রাত অতন্দ্র প্রহরীর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বিজিবি সদস্যরা।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমি যোগদান করেছি মাত্র কয়েক দিন হয়েছে, এই সীমান্ত এলাকায় মাদক, মানব পাচার ও অপরীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। এখানে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না, রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।