× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মোটা সুতার গ্রাম নারীদের হাতের স্পর্শে এখন মিহি মসলিন

কুমিল্লা সংবাদদাতা

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:৩৭ পিএম

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:৫৮ পিএম

নারীরা তৈরি করছেন মিহি মসলিন। ছবি : প্রবা

নারীরা তৈরি করছেন মিহি মসলিন। ছবি : প্রবা

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার সোনাপুর, কলাগাঁও, বাখরাবাদ, বেলাশহর, ভোমরকান্দি গ্রাম। এক সময় এসব গ্রামে তৈরি হতো মোটা সুতা। গ্রামের পুরুষরা খাদি ও থানকাপড় বুনতেন, কেউ তৈরি করতেন মোটা সুতা। এসব সুতা চলে যেত দেশের নানা প্রান্তে। গৃহিণীরা সুতা তৈরির কাজে সহায়তা করতেন। বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম জড়িয়ে ছিলেন এই পেশায়। এক পর্যায়ে মোটা সুতার উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়ে। সোনাপুর গ্রামের ৭০ বছরের বৃদ্ধ আবদুল মতিন এক নাগাড়ে বলে গেলেন এমন কথা। তবে আশার কথা, ওইসব মোটা কাপড় উৎপাদন হওয়া তিনটি গ্রামে উৎপাদন হচ্ছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মিহি মসলিন সুতা। তবে পুরুষের হাত ধরে নয়, নারীরা তৈরি করছেন এসব মিহি মসলিন।

২০১৮ সালের জুলাই থেকে কুমিল্লার দেবিদ্বার ও চান্দিনার তীরবর্তী গ্রাম সোনাপুর, দোতলা ও রামপুরে পরীক্ষামূলকভাবে মসলিন কাপড়ের উৎপাদন শুরু হয়। যাতে পৃষ্ঠপোষকতা করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ‘বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিন তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার প্রকল্প’-এর আওতায় ওই কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পে সফলতা এসেছে। বর্তমানে এসব উৎপাদিত সুতা দিয়ে নারায়ণগঞ্জে মসলিনের কাপড় উৎপাদন হচ্ছে। ফুটি কার্পাস তুলা নামের বিশেষ এক ধরনের তুলা দিয়ে তৈরি ওই সুতায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ তারাবো এলাকায় হ্যান্ডলুমে বুনন করা হয় মসলিন শাড়ি, ১৭০ বছর পর যা বাংলার ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করেছে। মসলিন পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করতে ভূমিকা রাখছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া বাসস্ট্যান্ডের পাশের গ্রাম সোনাপুর। এই গ্রামের চারটি বাড়িতে, পাশের রামপুরের দুটি বাড়িতে এবং দোতলা গ্রামের একটি বাড়িতে মসলিন কাপড়ের সুতা কাটা হয়। সোনাপুর মুন্সীবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি টিনের ঘরের দুটি কক্ষে চরকায় সুতা কাটছেন ৪৫ জন নারী। চরকা ঘুরাচ্ছেন এক হাতে, অন্য হাতে অল্প তুলা দিয়ে সুতা তৈরি করছেন। 

সোনাপুর গ্রামের নারী রোকসানা আক্তার বলেন, সোনাপুর ও আশপাশের গ্রামে আগে মোটা সুতা কাটা হতো। তাঁত বোর্ড থেকে চার বছর আগে তাদের ৪০ জনকে মসলিন কাপড়ের সুতা কাটার প্রশিক্ষণ দেয়। সেখান থেকে তাদের ছয়জনকে বাছাই করা হয়। তারা ছয়জন তিন গ্রামের ২২৬ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দেন। এক বছর ধরে তারা মসলিন সুতা কাটছেন। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত তারা সুতা কাটেন। প্রতিদিন ২৫০ টাকা মজুরি পান।

গ্রামের নাজমা আক্তার বলেন, ‘আমি এক বছর ধরে সুতা কাটার কাজ করছি। স্বামী অটোরিকশা চালক। ছেলেমেয়ে তিনজন। স্বামীর আয় দিয়ে সংসার চলছে। নিজের আয় দিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছি।’

রহিমা আক্তার বলেন, ‘গ্রামের মধ্যে নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারছি। এক বেলা আয় করছি, অন্য বেলা পরিবারকে সময় দিচ্ছি। এতে পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে।’ সোনাপুর গ্রামের মধ্যপাড়া কেন্দ্রের ফেরদৌসী আক্তার বলেন, ‘এ কাজ করতে পেরে আমরা খুব আনন্দিত। মজুরি আরেকটু বাড়ালে আমাদের সুবিধা হয়।’

ওই কেন্দ্রের প্রশিক্ষক নাজমা আক্তার বলেন, ‘গ্রামের নারীদের সুতা কাটার কাজে অনেক আগ্রহ। সবাইকেতো আর সুযোগ দেওয়া যায় না।’

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের অধীন বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিন সুতা ও কাপড় তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আইয়ুব আলী বলেন, ‘এই প্রকল্প ২০১৮ সালে শুরু হয়। কুমিল্লার চান্দিনা, দেবিদ্বার, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৩২৬ জন এই সুতা কটেন। ফুটি কার্পাস তুলা আনা হয় রাজশাহী ও গাজীপুর থেকে। মসলিনের সুতা মেশিনে কাটা সম্ভব নয়। ছিঁড়ে যায়। হাতে ধীরে ধীরে এই সুতা কাটতে হয়। একজন নারী দিনে ১ থেকে ২ গ্রাম সুতা কাটতে পারেন। রূপগঞ্জে ২৩ জন কাপড় তৈরি করেন। প্রতিটি কাপড়ের মূল্য ৭ লাখ টাকা।’

বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যায়, মসলিন শব্দটি এসেছে ইরাক থেকে। বিশেষ ওই শাড়ি ইরাকের মসুল নামক একটি স্থানে বিক্রি ও অতিসূক্ষ্ম কাপড় তৈরি করার ফলে তৎকালীন ইংরেজরা মসুল ও সূক্ষ্মএই দুইয়ের সমন্বয়ে কাপড়টির নাম দিয়েছিল মসলিন। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে মসলিন বলতে তৎকালীন ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় তৈরিকৃত সূক্ষ্ম কাপড়কে বোঝায়। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর তার স্ত্রী নূরজাহানকে মসলিন কাপড় দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কাঁচের মতো স্বচ্ছ ওই মসলিন কাপড় একটি আংটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে আনা-নেওয়া করা যেত এবং একটি দিয়াশলাই বাক্সে রাখা যেত বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। ১৮৫৬ সালের ইংল্যান্ডে মসলিন প্রদর্শনীর পর বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয় ঐতিহ্যবাহী ও রাজসিক মসলিন শাড়ি। আর পুনরুদ্ধার হয় ২০১৮ সালের নভেম্বরে। প্রথম শাড়িটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দেওয়া হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান মাঠ, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে গাজীপুরের শ্রীপুর খামার, নরসিংদীর পলাশ এলাকার তাঁত বোর্ডের মাঠে বিশেষ ফুটি কার্পাস তুলা চাষাবাদ হচ্ছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা