শামীম মিয়া, নরসিংদী
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ২০:০৮ পিএম
শুক্রবার ঘটে যাওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে নরসিংদীতে ব্যপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। এতে শিশুসহ ৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। ভূমিকম্পের ফলে মাটিতে ফাটলের বিষয়টি তদন্ত করতে নরসিংদীতে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এদিকে ভয়াল এই ভুমিকস্পের ক্ষত পুরো জেলা জুড়েই।
শনিবার (২২ নভেম্বর) দুপুরে পলাশ রেসিডেন্সিয়াল কলেজে ভূমিকম্পে জমির ফাটলকৃত স্থান পরিদর্শন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের ৬ সদস্য। তারা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছেন।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. আ.স.ম উবায়দুল্লাহ টিমসহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন। পলাশ রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিধস পরিদর্শন কালে তিনি জানান, আমরা এখন ভূমিকম্পের উপাত্ত সংগ্রহ করছি। এই ভূমিকম্পের ফলে পৃষ্ঠের মধ্যে কি কি নির্দশন আছে, যেগুলো ভূমিকম্পের সাথে জড়িত, আমরা তা পর্যবেক্ষণ করছি। যে ফাটলগুলো তৈরী হয়েছে, এগুলো ভূমিকম্পের কারণে অথবা কম্পণের ফলে। এখানকার ফাটলগুলো পরিদর্শন করে তা মাপা হচ্ছে। এগুলোর কি অবস্থা তা পর্যবেক্ষণ করছি। পরে সবকিছু সমন্বয় করে আমরা দেখবো ভূমিকম্প কেন হয়েছে। ভূমিকম্পের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি আমরা ইনটেনসিটি দিয়ে প্রকাশ করি। কম্পনের তীব্রতা কতটুকু এগুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এখান থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।’ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এর কারণ উদ্ধার করা হবে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রে প্রফেশনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, প্রাথমিকভাবে তাদের ওয়েবসাইটে মৃদু মাত্রার এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার ২৬ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর পলাশে। এ ভূমিকম্পে নতুন করে কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঘোড়াশাল সারকারখানা এবং ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে গত শুক্রবারের ভূমিকম্পে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কমবেশী দেড়শতাধিক কাঁচা, আধাপাকা ও বহুতল ভবনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সচেয়ে বেশী ভবনে ফাটল ধরে পলাশ উপজেলায়। পলাশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আবুবক্কর সিদ্দিকী জানান, উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় ৩০টি ভবনের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিস্তারিত জানার জন্য কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের ভয়াবহ ভূমিকম্পে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভবন থেকে তাড়াহুড়ো করে নামার সময় অন্তত শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু আহত হয়েছে। এই ঘটনায় পিতা-পুত্রসহ মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ইতিমধ্যেই সকলের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, সরকারী-বেসরকারী অন্তত শতাধিক ভবন ও বাড়ি-ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে ভূমিকম্পের ফলে। বিভিন্ন স্থানে মাটি ফেলে দু’ভাগ হয়ে গেছে। সকল উপজেলা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসব ক্ষতি নিরুপনে কাজ করে যাচ্ছে।
এদিকে ভূমিকম্পনে নিহতদের পরিবারে চলছে আহাজারি। শনিবার দুপুরে পলাশের চরসিন্দুর ইউনিয়নের মালিতা গ্রামে নিহত কাজেম ভূইয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার স্ত্রী সুফিয়া বেগম বিলাপ করছেন। এসময় তার ছেলে মনির মিয়া বলেন, আমার বাবা বাহির থেকে ঘরে যাওয়ার সময় মাটির ঘরের দেয়াল ধস হয়। তিনি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। তার দুই পা ভেঙে যায়। আমরা চেষ্টা করেছি তাকে বাঁচাতে কিন্তু পারিনি বাঁচাতে। তাকে পারিবারিক ভাবে দাফন করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের বিষয়ে নরসিংদী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অভজারবার আনোয়ার হোসেন জানান, নরসিংদীতে আবহাওয়া অফিস থাকলেও এসব বিষয়ে তেমন কোন তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। ভূমিকম্পসহ এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আবহাওয়া অফিস সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে যে ভূমিকম্প হয়েছিল তার উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে।
নরসিংদী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, ভূমিকম্পে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। তবে আহতদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। জেলায় প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ীর আংশিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। প্রায় শতাধিক লোক আহত হয়েছে। তবে গুরুতর আহতের সংখ্যা কম।