হাসান লিটন, চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:৪২ পিএম
আবু সুফিয়ান
মানুষ চোখে দেখে পথ খোঁজে, আর তিনি অন্ধকারেই দেখেছেন সম্ভাবনার আলো। জন্ম থেকে দুই চোখে দৃষ্টিহীন তবুও জীবনযুদ্ধে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা এক মানবিক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন ভোলার চরফ্যাশন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত আবুল কাসেম সিকদারের ছেলে আবু সুফিয়ান (৩৩)। তিনি শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তৈরি করেছেন নিজের কর্মক্ষেত্র, নিজের সম্মানের জায়গা।
চরফ্যাশন কলেজ রোডের পাশে প্রেসক্লাব সংলগ্ন ভ্যান গাড়িতে করে ছোট একটি ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান পরিচালনা করছেন তিনি। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) দুপুরের দিকে দেখা যায়, তিনি টিউবওয়েল থেকে পানি এনে নিজেই চা তৈরি করছেন। পরে কাস্টমারের কাছে চা, পান, সিগারেট, বিস্কুটসহ যাবতীয় পণ্য হাসিমুখে বিক্রি করছেন।
এসময় কথা হয় আবু সুফিয়ানের সাথে । তিনি বলেন, আমি জন্মের পর থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। কখনও দুই চোখে মা-বাবাকে দেখতে পাইনি। শুধু কথা বলার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ছয় বছর আগে বিয়ে করেছি, স্ত্রীর মুখও দেখতে পাইনি কিন্ত কথা বলেছি। আমার দাম্পত্য জীবনে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তাদের মুখও আমি দেখিনি। আমার বিয়ের ৩ বছর পর আমার স্ত্রী আমার দৃষ্টি নেই বলে বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। ১৮ বছর বয়স থেকেই আমি কারো কাছে ভিক্ষা না চেয়ে আত্মসম্মান বজায় রাখতে চায়ের দোকান করছি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন দুপুরের পর বাড়ি থেকে বের হয়ে পায়ে হেঁটে হেঁটে লাঠি নিয়ে খোঁজখুঁজি করে সৃতি শক্তির মাধ্যমে চরফ্যাশনে নিজের দোকানে হাজির হই। এরপর দোকান খুলে নিজেই টিউবওয়েল থেকে পানি এনে চা তৈরি করি। আমার দোকানে নিয়মিত প্রায় ৯শ থেকে ১ হাজার টাকা বিক্রি হয়, যা থেকে ২০০ টাকার মত লাভ হয়। এই সামান্য আয়ের মধ্য দিয়েই আমি নিজেসহ সন্তান ও মা-বোনের ভরণপোষণ চালিয়ে যাচ্ছি। আমি সব ধরনের টাকা হাতের অনুমানের মাধ্যমে চিনতে পারি। যদি ইচ্ছাশক্তি থাকে, সবকিছু সম্ভব। আমি চাই সমাজ আমাদের মতো মানুষদের মূল্যায়ন এবং সহায়তা করুক।
পাশবর্তী ব্যবসায়ী মো. তানভির বলেন, চোখে না দেখেও কেউ নিজের দোকান চালাতে পারে, সেটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে কেউ যদি চা, পান, সিগারেট ক্রয় করে, তাহলে সে সহজেই তা দিতে পারে। । তিনি হাত দিয়ে টাকা পরীক্ষা করতে পারেন। এটি তার দক্ষতা ও সততার প্রমাণ। তার ধৈর্য, মনোবল ও পরিশ্রম আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা সবাই তাকে সম্মান করি।
সদরের বাসিন্দা শামিম হোসেন বলেন, দৃষ্টিহীন হয়ে থাকলেও তিনি পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। সরকার যেন তার পাশে দাঁড়ায়, যাতে তার সংগ্রাম আরও সমৃদ্ধ হয়।
চরফ্যাশন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মামুন হোসেন বলেন, আবু সুফিয়ানকে সহায়ক ভাতার আওতায় আনা হবে, এবং তার দোকান উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা করা হবে।