রফিকুল ইসলাম, বেড়া-সাঁথিয়া (পাবনা)
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৫২ এএম
আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:১৪ পিএম
পাবনার বেড়া উপজেলার খাসচর এলাকায় নতুন ফেরিঘাট স্থাপনের উদ্যোগ ঢাকার সঙ্গ উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের মতে, এ ঘাট চালু হলে উত্তরবঙ্গ ও ঢাকার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের পথ প্রশস্ত হবে। এতে ঢাকামুখী যাতায়াতে সময় ও খরচ কম লাগবে। একই সঙ্গে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য খাতের নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
একসময় যমুনা নদীর তীরে নগরবাড়ী ফেরিঘাট ছিল উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের নির্ভরশীল একমাত্র অবলম্বন। ১৯৬৪ সালে ঘাটটি চালু হলে ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়। ১৯৯৭ সালে যমুনা সেতু চালু হলে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় নগরবাড়ী ফেরঘাট। এতে পাবনা ও আশপাশের জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি নদীপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে শিল্প, তাঁত, দুগ্ধপ্রসেসিং ও কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় নেমে আসে বিরূপ প্রভাব।
তবে নগরবাড়ী ফেরঘাট বন্ধ হওয়ার দীর্ঘ সময় পর ঘাটটি স্থানান্তর করা হয় কাজিরহাটে। কয়েক বছর ধরে আরিচা ও কাজিরহাট ফেরিঘাট চালু হওয়ায় উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পারাপার অব্যাহত থাকে। কিন্তু পলি জমে অগভীর হয়ে পড়ায় কাজিরহাট ঘাটটিও চলাচলে প্রতিবন্ধকতার আবর্তে পড়ছে। কোটি কোটি টাকা খরচে ড্রেজিং করেও নাব্যতা দূর হচ্ছে না। অন্যদিকে খাসচর জায়গাটি পদ্মা ও যমুনার তীরমুখে হওয়ায় এখানে সারা বছর নাব্যতা বজায় থাকে। এ কারণে খাসচর ফেরিঘাট স্থাপিত হলে সারা বছরই স্বাচ্ছন্দ্যে ফেরি চলতে পারবে।
খাসচর টু আরিচা নৌপথ চালুর দাবি উত্তরাঞ্চলে মানুষের। প্রকৌশল জরিপ অনুযায়ী, খাসচরে ফেরিঘাট হলে খাসচর ও আরিচা নদীপথে পারাপারের সময় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা কমে যাবে। মাত্র আধা ঘণ্টায় খাসচর-আরিচা পারাপার সম্ভব হবে।
গত ৩ অক্টোবর নৌ ও রেলন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা কাজিরহাট ফেরিঘাট স্থানান্তর করে খাসচরে চালুর উদ্যোগও নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে খাসচর পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান এখানে ঘাট হলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হবে।
ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম জানান, পণ্য পরিবহনে সময় কমলে উৎপাদন খরচ কমবে, বাজার সম্প্রসারণ ও মূল্য স্থিতিশীলতা বাড়বে। ফলে লাভবান হবে পাবনার তাঁত শিল্প, হোসিয়ারি, পাটজাত পণ্য ও দুগ্ধপ্রসেসিং প্রতিষ্ঠানগুলো। কৃষকের পেঁয়াজ, রসুন, সবজি ও ধান দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে।
বেড়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা সাংবাদিক মহসীন মল্লিক বলেন, খাসচরে ফেরিঘাট স্থাপিত হলে এটি হবে যমুনা সেতুর একটি বিকল্প নদীপথ। পাবনা হয়ে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি ও দ্রুত বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। এতে আঞ্চলিক অর্থনীতি যেমন চাঙ্গা হবে, তেমনই দেশের সামগ্রিক জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে।
স্থানীয়রা জানান, নতুন ফেরিঘাটকে কেন্দ্র করে দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট, গুদাম, পরিবহন অফিস ও নৌযান সার্ভিস গড়ে উঠবে। এতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বেড়া পৌরসভা ও আশপাশের ইউনিয়নগুলোর জমির মূল্য বাড়বে, নগরায়ণ ত্বরান্বিত হবে। বেড়া হয়ে উঠবে নতুন বাণিজ্যকেন্দ্র।
খাসচরে ফেরিঘাট প্রসঙ্গে বেড়া উপজেলা বিএনপি প্রবীণ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এসএম আব্দুস সামাদ লাল বলেন, বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পাবনার মানুষকে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। ঢাকায় চিকিৎসা, শিক্ষা ও জরুরি কাজে দ্রুত যাতায়াত সম্ভব হবে, কমবে জনদুর্ভোগ।
নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাজিয়া আফরিন বলেন, পরিবেশ ও নদীর স্রোত বিবেচনায় সঠিক পরিকল্পনা হলে খাসচর ফেরিঘাট পাবনাকে আবারও দেশের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য নেটওয়ার্কে ফিরিয়ে আনবে। সার্বিকভাবে খাসচরে ফেরিঘাট স্থাপন শুধু যাতায়াত সহজ করবেই না, উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতও নতুনভাবে বিনির্মাণ করবে এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, সওজ (চলতি দায়িত্ব), সড়ক উপবিভাগ-২, সাদেকুর রহমান বলেন, ‘খাসচর এলাকায় ফেরিঘাট স্থাপনের বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। এখানে যমুনার নাব্যতা এবং নৌপথের গভীরতা ফেরি চলাচলের জন্য অনুকূল। ৫.৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। সঠিক নকশা, ঘাট সুরক্ষা এবং পাড় রক্ষা কাঠামো নির্মাণ করা হলে এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। খাসচর ফেরিঘাট চালু হলে পাবনা ও রাজশাহী তথা গোটা উত্তরবঙ্গের মানুষ ঢাকায় যেতে সময় ও ব্যয় দুই কমাতে পারবে, যা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যদিও বিষয়টি এখনও প্রস্তাবরত রয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে কাজটি শুরু করা হবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করেছি এবং প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।