বাকেরগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৫৪ পিএম
আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৫৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ছয় বছর অপেক্ষার পর বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রাঙামাটি নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতুর সর্বশেষ স্প্যানটি বসানো হয়েছে। এরই মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ দৃশ্যমান হলো বাকেরগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি উপজেলার লাখো মানুষের স্বপ্নের সেতু । বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) সফলভাবে বসানো হয় এই স্প্যান । গোমা সেতু বরিশালের দিনারেরপুল-লক্ষ্মীপাশা-দুমকি আঞ্চলিক সড়কের অংশ হিসেবে নির্মিতব্য স্থানীয় বাকেরগঞ্জ, দুমকি এবং পটুয়াখালী জেলার কয়েকটি উপজেলার লক্ষ মানুষের কাছে এক স্বপ্ন পূরণের নাম। বরিশাল বিভাগীয় শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের মানুষদের দীর্ঘকাল ধরে খেয়া বা ফেরি পারাপারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ফেরি পারাপারে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া বা শিক্ষার্থীদের সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো ছিল এক কঠিন সংগ্রাম। কোনো কারণে ফেরি বন্ধ থাকলে এই সব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা পুরোপুরি থমকে যেত। গোমা সেতু চালু হলে এই দুর্ভোগের পুরোপুরি অবসান ঘটবে।
গোমা সেতুর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬০ মিটার (২,৫৪০ ফুট)। প্রাথমিক ব্যয় (২০১৭) প্রায় ৫৭ কোটি টাকা, তবে সংশোধিত ব্যয় (২০২২) প্রায় ৯২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা (বৃদ্ধি: ৩৪ কোটির বেশি)। সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উদ্বোধনের সম্ভাবনা।
সেতুর নির্মাণ কাজ দীর্ঘসূত্রতার মূল কারণ ছিল দুটি- সরকারি সংস্থা, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর মধ্যে উচ্চতা নিয়ে মতবিরোধ।
প্রাথমিক নকশা:
২০১৫ সালে বিআইডব্লিউটিএ-এর দেওয়া অনাপত্তি অনুযায়ী, বর্ষার সর্বোচ্চ পানির স্তর
থেকে সেতুর উচ্চতা ধরা হয়েছিল ৭.৬২ মিটার। সেই অনুযায়ী কাজ শুরু হয়।
বিআইডব্লিউটিএ-
এর নতুন আপত্তি (২০১৯): ২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ জানায় যে, রাঙামাটি নদী এখন দ্বিতীয়
শ্রেণির নৌপথ। তাই বড় নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে সেতুর উচ্চতা বাড়িয়ে কমপক্ষে ১২.২০
মিটার করতে হবে। এই উচ্চতা বৃদ্ধির দাবিতে কাজ বন্ধ করে দেয়। নকশা পরিবর্তন, বাজেট
বৃদ্ধি এবং নতুন অনুমোদনের জন্য প্রায় দুই বছর কাজ সম্পূর্ণ থমকে ছিল, যা স্থানীয়
লাখো মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। জটিলতা নিরসন ও নকশা পরিবর্তন একনেকে অনুমোদন
(২০২২)। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০২২ সালে নকশা
সংশোধন করে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ে প্রকল্পটি আবার একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন
পায়।
বিশেষ স্প্যান:
নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সিদ্ধান্ত হয় যে, সেতুর মাঝের দুটি স্প্যান (৪ ও ৫ নম্বর)
স্টিল ট্রাস্ট স্প্যান প্রযুক্তিতে তৈরি করা হবে। এই বিশেষ স্টিল কাঠামোটি অন্যান্য
স্প্যানগুলোর তুলনায় ৯.১৪ মিটার উঁচু হবে, যা নৌপথ সচল রাখতে সাহায্য করবে। ঠিকাদারী
প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে জটিলতা ও অগ্রগতি
গোমা সেতু
নির্মাণে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এম খান গ্রুপ-কে অনেক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি
হতে হয়েছে।
কাজের স্থবিরতা:
এই জটিলতার কারণে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দুই বছর কাজ বন্ধ রাখতে হয়, যদিও তারা
ততদিনে প্রায় ৪৪-৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছিল।
নকশা পরিবর্তন
ও ব্যয় বৃদ্ধি সংশোধিত সিদ্ধান্ত: আন্তঃমন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ আলোচনার পর সওজ ঠিকাদারী
প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে সেতুর নকশা সংশোধন করে।
নতুন প্রযুক্তির
ব্যবহার: উচ্চতা বাড়ানোর জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সেতুর মাঝের স্প্যানগুলোতে (৪ ও
৫ নম্বর পিলার) কংক্রিটের গার্ডারের বদলে স্টিল ট্রাস্ট স্প্যান প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে।
নকশা পরিবর্তন এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের
কারণে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায় এবং প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ে।
বর্তমান অগ্রগতি দীর্ঘ জটিলতা কাটিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দ্রুততার সাথে কাজ শেষ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এম খান গ্রুপ বাকি কাজ দ্রুত শেষ করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুটি যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত করতে পারবে।
গোমা সেতু চালু হলে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে। বর্তমানে ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, যা অসুস্থ রোগী বা জরুরি সেবার জন্য মারাত্মক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। সেতু চালু হলে এই সড়কপথে যাতায়াত হবে দ্রুত, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।
কর্তৃপক্ষ
আশা করছে, স্প্যান বসানোর পর দ্রুত সংযোগ স্থাপন ও ফিনিশিং কাজ শেষ করে ডিসেম্বর মাসের
মধ্যেই সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। সেতুটির কাঠামো দৃশ্যমান হওয়ায়
স্থানীয়দের মাঝে নেমে এসেছে স্বস্তি।
স্থানীয়দের
ভাষ্য: দীর্ঘ ছয় বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষকে ফেরি ও ট্রলারে ঝুঁকিপূর্ণভাবে নদী পার
হতে হয়েছে। সময়মতো হাসপাতালে রোগী নেওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
পৌঁছানো ছিল এক কঠিন সংগ্রাম। সেতুটি চালু হলে সেই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের পুরোপুরি অবসান
ঘটবে।