পিয়াল হাসান রিয়াজ, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:০৮ পিএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর পৌরসভা যেন এখন অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। দিন দিন বেড়ে চলেছে চুরি, মাদক ও গুলির মতো ভয়াবহ অপরাধ। একের পর এক ঘটনায় কেঁপে উঠছে পৌরবাসী, অথচ প্রতিবারই অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সিসি ক্যামেরা ব্যবস্থা না থাকা, রাতে পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং কার্যকর নজরদারি না থাকা। ফলে পুলিশ চাইলে অপরাধের সূত্র খুঁজে পাচ্ছে না, আর দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে অপরাধ ঘটিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।
নবীনগর পৌর এলাকার পদ্মপাড়া, পশ্চিম পাড়া, কোর্ট রোড ও টিএনএটি রোড সহ পৌর এলাকার অনেক ওয়ার্ডের বিভিন্ন অংশে এখনো নেই স্ট্রিট লাইট বা নিরাপত্তা বাতি। রাত নামলেই অন্ধকারে ঢেকে যায় রাস্তাগুলো, যা দুর্বৃত্তদের জন্য হয়ে উঠছে নিরাপদ আশ্রয়।
সাম্প্রতিক পদ্মপাড়ায় ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ঘটনাগুলোই যেন পৌরসভার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে আদালত পুকুরপাড়ের ‘বউ সাজ বিউটি পার্লার’ থেকে জাল নোট ও অস্ত্রসহ একটি ব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই এলাকার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ অস্পষ্ট থাকায় ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়নি।
এরপর ১৫ অক্টোবর একই এলাকার মাইন উদ্দিন সওদাগরের বাড়ির তৃতীয় তলায় প্রবাসী শরীফ মিয়ার বাসায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা ঢুকে নগদ সাত লক্ষ টাকা ও দুই ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। আশেপাশে কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকায় শুরুতে কোনো সূত্র না মিললেও শেষ পর্যন্ত এক দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ ঘেঁটে পুলিশ একজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে। পুলিশ বলছে, সঠিকভাবে ক্যামেরা বসানো থাকলে অপরাধী শনাক্তে সময় লাগতো না।
এর মাত্র দশ দিন পর গত ২৪ অক্টোবর একই পদ্মপাড়ায় গুলি খেয়ে গুরুতর আহত হন উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান মুকুল। দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি চালায়, যার দুটি পিঠে ও একটি কোমরের নিচে লাগে। ঘটনাস্থলে কোনো সিসি ক্যামেরা বা লাইট না থাকায় অপরাধীদের শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে থানা পুলিশ। একাধিক ঘটনার পরও পৌরসভার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও আতঙ্ক।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বাজার কমিটির উদ্যোগে কিছু জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই অকার্যকর। অনেক ক্যামেরা মাসের পর মাস বন্ধ পড়ে থাকলেও তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে অপরাধ সংঘটিত হলেও পুলিশের হাতে থাকে না কোনো প্রমাণ। নিরাপত্তাহীনতায় ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
উপজেলা দুর্নীতি দমন কমিটির সভাপতি আবু কামাল খন্দকার বলেন, বিভিন্ন ওয়ার্ডের পাড়া-মহল্লায় যদি প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থা করা এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়, তাহলে আমার ধারণা অপরাধ অনেকাংশে কমে যাবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নবীনগর পৌর প্রশাসক রাজীব চৌধুরী বলেন, ‘জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের অগ্রাধিকার। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো। অনেক স্থানে লাইট না থাকায় আমরা ইতিমধ্যে ২০০টি নতুন লাইট ক্রয় করেছি, কারণ অন্ধকার থাকলেই অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা যায় কি না—বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’