সুনামগঞ্জের মধ্যনগর
রাসেল আহমদ, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ১০:২৫ এএম
বর্ষায় সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের নিশ্চিন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। প্রবা ফটো
বর্ষা নামলেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। হাঁসফাঁস করে জীবনের গতি, থেমে যায় শিক্ষার চাকা। স্কুলে যাওয়ার পথ হয়ে ওঠে পানিপথ, আর নৌকা হয় জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ সঙ্গী। বর্ষার ছয় মাসে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অর্ধেকে নেমে আসে। বছরের ছয় মাস জলবন্দি হয়ে পড়া এই জনপদে শিক্ষা যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে এক মৌসুমি বাস্তবতা।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মধ্যনগর উপজেলা দেশের অন্যতম দুর্গম হাওর এলাকা। বর্ষায় এখানে সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘ছয় মাস নাও, ছয় মাস পাও’। অর্থাৎ বর্ষায় জলপথই একমাত্র ভরসা। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়কেই ট্রলার বা নৌকায় করে প্রতিদিন হাওর পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বৈরী আবহাওয়া, ঝড়-বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ এই যাত্রা হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া মধ্যনগরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই শিক্ষকদের থাকার কোনো ব্যবস্থা। নেই বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো নৌযান। ফলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যথাসময়ে যাতায়াতে সমস্যা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নারী শিক্ষকরা নিরাপত্তার অভাবে স্কুলে পৌঁছাতে হিমশিম খান।
অন্যদিকে, প্রাথমিকের খুদে শিক্ষার্থীদের অনেকেই সাঁতার জানে না। ফলে বর্ষায় সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পান অভিভাবকরা। প্রতি বছর হাওরে নৌকাডুবিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় এই ভয় আরও বাড়িয়ে তোলে। এ কারণে অনেকেই সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে নিরুৎসাহিত বোধ করেন।
সরেজমিন বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ের সঙ্গে গ্রামের সংযোগ সড়কটি তলিয়ে গেছে পানিতে। শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা নৌকা। কিন্তু সবার পক্ষে নৌকা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। আবার যারা নৌকায় আসেন, তাদের অনেকেই নিয়মিত উপস্থিত হতে পারেনা বৈরী আবহাওয়া, বন্যা ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে। বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, প্রতি বছর বর্ষায় আমরা বুঝি, শিক্ষাটা এখানে একটি মৌসুমি বিষয় হয়ে গেছে। বর্ষায় শিশুরা স্কুলে আসতে পারে না, শিখতেও পারে না।
মধ্যনগর সদর ইউপি চেয়ারম্যান সঞ্জীব রঞ্জন তালুকদার টিটু বলেন, আগে হাওরে ‘বাংলো’ প্রথা চালু ছিল, যেখানে শিক্ষকরা থাকতেন ও স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। এখন সেই প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় শিক্ষকরা আবাসন সমস্যায় পড়েছেন, বিশেষ করে নারী শিক্ষকরা। বর্ষাকালে হাওরের কোমলমতি নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতে সরকারি হস্তক্ষেপ এখন জরুরি।
কাকরহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমূল গনী তালুকদার বলেন, সরকারি বা স্থানীয় উদ্যোগে বর্ষায় উপযোগী নৌযান বরাদ্দ করা হলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের জন্য যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ হবে।
মধ্যনগর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্ষাকালে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যাওয়া একটি বাস্তবতা। আমরা এই সমস্যা সমাধানে প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য সরকারি নৌযান বরাদ্দের একটি প্রস্তাব প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠিয়েছি।