রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৮:৫৩ পিএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১৭ এএম
প্রতি বছর কার্তিক মাসের শুরুতে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের মাঝামাঝি সুক নদীর উপর নির্মিত বুড়িরবাঁধে জমে থাকা পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। আর এই পানি ছাড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহা মাছ ধরার উৎসব। জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পঞ্চগড়, দিনাজপুরসহ আশপাশের জেলা থেকে হাজারো মানুষ ভিড় করেন মাছ ধরতে। কেউ আসে শখে, কেউ আসে মাছ কেনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এবছর দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। মাছ কম, অভিযোগের ঝুলি ভারি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮০ সালে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি জমির সেচ সুবিধার জন্য ঠাকুরগাঁও সদর আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের মাঝামাঝি একটি জলকপাট নির্মাণ করা হয়। আর সেই জলকপাটে আটকে থাকা পানিতে প্রতিবছর মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা ছাড়া হয়। আর এ পোনাগুলোর দেখভাল করে আকচা ও চিলারং ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্যরা।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল থেকে চলে মাছ ধরা মহাউৎসব শুরু হলেও গত শুক্রবার রাতে বুড়ির বাঁধের জমে থাকা পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে অংশ নেয় জেলার মানুষজন ছাড়াও আশেপাশের জেলার মানুষ। পলো, ঠেলা, বাদাই, খেয়া, টানা, ফিকা, কারেন্ট জালসহ মাছ ধরার নানান উপকরণ মাছ শিকার করে মানুষজন। এদের বেশিরভাগই শৌখিন মাছ শিকারি।
রাণীশংকৈল থেকে আসা জেলে বাবুল হোসেন বলেন, প্রতিবছর আমি বুড়িরবাঁধে আসি মাছ ধরতে। গত কয়েকবছর ধরে মাছ কম পাচ্ছি। তবে এবার তো একেবারে নেই বললেই চলে। শনিবার রাত থেকে জাল ফেলছি, কিন্তু অল্প কিছু ছোট মাছ ছাড়া বড় কোনো মাছ জালে উঠেনি। সব জায়গা বাঁশ দিয়ে আগেই দখল করে রেখেছে স্থানীয় কিছু লোক। আর রিং জালের জন্য জালে মাছ উঠছে না। তাই মাছ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছি।
শুধু বাবুল হোসেনই নন, এবারে প্রায় অধিকাংশ জেলেই মাছ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।
পীরগঞ্জ থেকে আসা শৌখিন মাছ শিকারি বিশু পাল বলেন, প্রতিবছর এই সময় বুড়িরবাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরা সবাই উৎসবে মেতে উঠি। তবে এবার মাছ তেমন পাইনি, অল্প কিছু দেশি মাছ ধরেছি। এটা নিয়ে বাড়ি ফিরবো।
পঞ্চগড় থেকে আসা মাছ শিকারি আরিফ জানান, শুক্রবার রাত থেকে কলাগাছের ভেলায় করে মাছ ধরছি। যা পাইছি, তাতে সারারাতের কষ্ট বিফলে গেছে। বড় মাছ পেয়েছি মাত্র ৩টা, ওজন ২ কেজি। আর ছোট মাছ পেয়েছি ৪ কেজির মতো। এতে আমাদের খরচ উঠবে না।
বালিয়াডাঙ্গী থেকে আসা মাহাবুব হোসেন বলেন, রাতে পানি বেশি থাকায় নামিনি। সকাল ৬টা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ৩–৪ কেজি মাছ পেয়েছি। মাছ কম হলেও আনন্দ পেয়েছি।
শহরের রোড এলাকা থেকে মাছ ধরতে আসা আব্দুর রহমান জানান, বন্ধুদের নিয়ে জাল কিনে মাছ ধরতে এসেছি। মূলত শখ থেকেই আসা।
বোদা পঞ্চগড় থেকে মাছ শিকার করতে আসা ইমু বলেন, বুড়ির বাঁধে মাছ ধরের কথা অনেক শুনছি। তাই ২ ভাই শখ করে মাছ ধরতে আসছি। এখন পর্যন্ত ২ কেজির মত মাছ ধরছি। বড় কোন মাছ এখন ধরতে পারিনি।
সদর নারগুন ইউনিয়নের বসির আহম্মেদ বলেন, আগের মত বাধেঁ আর মাছ নাই। বাঁধ ছাড়ার আগে ছিপ দিয়ে বড় সব মাছ তুলে ফেলে আশাপাশের মানুষজন। ঝাড় দিয়ে সব জায়গা দখল করে রেখেছে স্থানীয় কিছু লোক।
বুড়িরবাঁধে মাছ কিনতে আসা আইনুল হক বলেন, প্রতিবছর এখান থেকে দেশি মাছ কিনি। কিন্তু এবার মাছ নেই। সকাল ৮টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি, এখন বাজে ১২টা, তেমন মাছ দেখিনি। যা পেয়েছি, তার দাম দ্বিগুণ। এবার মাছ না নিয়েই ফিরতে হচ্ছে।
বাজারের ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, এবার মাছের দাম অনেক বেশি। কেউ কেউ বাইরের মাছ এনে এখানকার দেশি মাছ বলে বিক্রি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কালিবাড়ি বাজারের ব্যবসায়ী প্রবীর রায় জানান, মাছ অনেক কম। তাই দামও বেশি। তবে উৎসবের আমেজ আছে।
আকচা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সারোয়ার চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর বাঁধের পানি ছেড়ে দিয়ে মাছ ধরার উৎসব আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসে। এটা একটা মিলনমেলায় রূপ নেয়। তবে এবছর মাছ কম, মানুষের উপস্থিতিও কম ছিল।
জেলার মৎস্য কর্মকর্তা আরাফাত উদ্দিন আহম্মেদ জানান, বুড়িরবাঁধ একটি মৎস্য অভয়াশ্রম। সারা বছর কেউ এখানে মাছ ধরতে পারে না। এই বাঁধে প্রতিবছর পানি ছেড়ে দেওয়ার পর মাছ ধরার সুযোগ দেয় মৎস্য অধিদপ্তর। আমরা নিয়মিত তদারকি করি। এবছরও ৩৫ কেজি বিভিন্ন জাতের মাছের রেণু ছাড়া হয়েছিল। বুড়িরবাঁধে মাছ ধরার উৎসব এখন আর শুধু মাছ শিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক মিলনমেলা।