ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১২:২২ পিএম
খুলনা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে খানজাহান আলী থানার শিরোমণি এলাকায় ঢুকলেই চোখে পড়ে পুরনো কারখানার জীর্ণ গেট, মরিচাধরা চিমনি আর নীরব প্লটের সারি। অথচ এক সময় যে শিল্পনগরী খুলনার অর্থনৈতিক নবজাগরণের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, আজ তা দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ণ স্বপ্নের এক স্মারক হয়ে।
১৯৬৬ সালে খুলনার শিরোমণিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) শিল্পনগরী। প্রায় ৪৪ দশমিক ১০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ নগরীর লক্ষ্য ছিল স্থানীয় শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে এর কার্যক্রম নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু সেই গতি বেশিদিন টেকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেছে উন্নয়নের চাকা।
বিসিক কর্তৃপক্ষের তথ্য, শিল্পনগরীর ২৪৪টি প্লটের মধ্যে ২৪০টি ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮৪টি প্লটে স্থাপিত হয়েছে শিল্প ইউনিট, যার মধ্যে ৬৬টি বর্তমানে চালু। চালু ইউনিটগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯টি খাদ্যজাত, ৪টি পাটজাত, ৬টি বনজ, ৩৪টি কেমিক্যাল, ৫টি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, ১২টি প্রকৌশল শিল্প এবং আরও কয়েকটি ইলেকট্রনিক্স, চামড়াজাত ও বস্ত্র শিল্প। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার রাজস্ব আসে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। তবে বিসিক খুলনা কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমানে কোনো প্লট নেই। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়েছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তারা শিল্প স্থাপনে আগ্রহী। কিন্তু জায়গার স্বল্পতায় নতুন বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, উত্তরসূরির অভাব এবং আইনি জটিলতায় অনেক প্রতিষ্ঠান বছরজুড়ে বন্ধ থাকে।
ব্যাংক মামলা, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদ এবং প্রশাসনিক জটিলতায় অনেক প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর তালাবদ্ধ।
একজন স্থানীয় উদ্যোক্তা বলেন, জায়গা না থাকলে নতুন বিনিয়োগ করব কীভাবে?
দীর্ঘদিন গ্যাস সংযোগ না থাকায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল। এখন গ্যাস লাইন শিল্পনগরীতে কিছুটা পৌঁছেছে। বিসিক কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম বলেন, গ্যাস সংযোগ পেলে উৎপাদন খরচ ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। পুরনো কারখানাগুলোর টিকে যাবে।
শিরোমণি বিসিকে বর্তমানে সক্রিয় হ্যামকো গ্রুপের আবদুল্লাহ ব্যাটারি, খোরশেদ মেটাল, আয়শা ফ্লাওয়ার, মাহবুব ব্রাদার্স (অটো রাইস), জুট স্পিনার্স, জামান ফাউন্ড্রি, বেঙ্গল অ্যান্ড কোং, এসএম ইঞ্জিনিয়ারিং, তারক অ্যান্ড পরশ ফ্লাওয়ার মিল, মিতালী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলনার স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। বিশেষ করে শ্রমঘন খাতে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ না বাড়লে এই সাফল্য স্থায়ী হবে না।
পদ্মা সেতু চালুর পর খুলনার সঙ্গে ঢাকার যাতায়াত সময় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, খুলনা জেলায় নতুন একটি বিসিক শিল্পনগরী স্থাপন করা গেলে পদ্মা সেতুর সর্বোচ্চ সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশ যত শিল্পোন্নত হচ্ছে, ততই পিছিয়ে পড়ছে খুলনা বিসিক। এখন যোগাযোগ ভালো, বিদ্যুৎ আছে, গ্যাস আসছে- তবু কোনো অগ্রগতি নেই।
পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়ক মাহফুজুর রহমান মুকুল অভিযোগ করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শিরোমণি শিল্পনগরীর অনেক কারখানা পরিবেশ আইন মানছে না। বর্জ্য সরাসরি খাল-বিলে ফেলা হচ্ছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা শিরোমণি বিসিকের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য পাঁচটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন- রুগ্ণ শিল্প পুনর্বাসন কর্মসূচি, শিল্পনগরীর জায়গা সম্প্রসারণ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ কেন্দ্র, এক জানালায় অনুমোদন ব্যবস্থা ও আইনি জটিলতা নিরসন।
খুলনাবাসী বলছেন, ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও শিরোমণি বিসিক শিল্পনগরী এখনও অপ্রাপ্তির গল্প শোনায়। তবে পদ্মা সেতু, গ্যাস সংযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি এবং নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের আগ্রহ- সব মিলিয়ে সম্ভাবনার নতুন জানালা খুলছে।