আতঙ্কে বরগুনা উপকূলবাসী
রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ১৮:৫৪ পিএম
‘এক সময় ঘর ছিল, জমি ছিল আর এহন তা সব নদীতে খাইছে। এখন বাঁধও ভাঙে, মনও ভাঙে’। চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন বেতাগীর বৃদ্ধ হাশেম আলী।
বরগুনা উপকূলের মানুষের জীবন যেন এক অনন্ত সংগ্রাম। জলোচ্ছ্বাস, বন্যা আর নদী ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকা এই মানুষদের ভরসার জায়গা ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। কিন্তু সেই বাঁধ এখন আর নিরাপত্তা নয়, বরং ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর জেলার বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে যায়। সরকারি হিসাবে বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে বছরে গড়ে ৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়, কিন্তু বাস্তবে তার সুফল খুব একটা মেলে না। একটু বৃষ্টি বা জোয়ার এলেই বাঁধের দুর্বল অংশ ভেঙে পড়ে, তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধ সংস্কারের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ড যেসব প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সেগুলো সাময়িক উপকারে আসলেও স্থায়ীভাবে উপকূলীয় নিঃস্ব হওয়া মানুষের জানমাল রক্ষায় কাজে আসে না। কিছুদিন যেতে না যেতেই পানিতে ভেসে যায়। তাই টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবি জেলার লাখো মানুষের। অপরদিকে, জনসাধারণের এমন অভিযোগের বিপরীতে পাউবো কর্মকর্তাদের দাবি, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় শুধু বাঁধের জরুরি মেরামত করা হচ্ছে।
পালের বালিয়াতলীর জেলে নাসির উদ্দীন শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বলেন, এখন ভাঙতে ভাঙতে আমাদের ঘর উঠানোর জায়গা নাই। বাপ-দাদার বাড়িঘর ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া ছাড়াও উপায় নাই। আমাদের পরিবারের জমি ছিল তিন একর। নদী ভাঙনে দুই দফায় বাড়ি স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছি। এখন বাঁধের পাশে ছোট ঘর করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকছি। এভাবেই অনিশ্চয়তায় মদ্যে রয়েছেন পালের বালিয়াতলীর বহু মানুষ।

সম্প্রতি দেখা গেছে, চার বছর আগেও যেখানে লোকজনের বসতভিটা, বাজার ছিল- এখন তা পায়রা নদীতে তলিয়ে গেছে। ভাঙন রোধে পাউবো একাধিকবার জরুরি মেরামত করলেও তা কোনো কাজেই আসছে না। এ বছর জরুরি বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। তবে বাঁধের পাশ থেকে মাটি কেটে বাঁধ মেরামত নিয়ে নানা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
বরগুনা জেলায় বেড়িবাঁধের দৈর্ঘ্য ৮০৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে অন্তত দুই কিলোমিটার বাঁধ খুব ঝুঁকিপূর্ণ বলে পাউবো কর্মকর্তারা জানান। তাদের ভাষ্য, পাঁচ বছরে বরগুনায় জরুরি বাঁধ মেরামতে খরচ হয়েছে ৪০ কোটি ১৯ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ কোটি ১৭ লাখ ৩৫ হাজার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৮০ হাজার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ কোটি ১২ লাখ ২৬ হাজার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২০ কোটি ২৪ লাখ ও ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ৬৭লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেশি খরচ হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, টেকসই বাঁধ নির্মাণের পরিবর্তে বছরে বছরে কেবল অস্থায়ী মেরামত চলছে, যা প্রকৃত সমাধান নয়। ফলে সরকারিভাবে ব্যয় হলেও সেই অর্থের সুফল উপকূলের মানুষ পাচ্ছেন না।
পাউবোর তথ্য বলছে, জেলার তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙ্গা, নলবুনিয়া ও নিশানবাড়িয়া এলাকায় ২০১৮ সাল থেকে বেড়িবাঁধ রক্ষা, সাইক্লোন ও উচ্চ জোয়ারের পানি প্রবেশ রোধে এক হাজার ১০০ মিটার বেড়িবাঁধ সংস্কারে খরচ হয়েছে দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব সংস্কার তাদের বাপ-দাদার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষায় কাজে আসেনি। বাঁধ মেরামত করতে না করতেই তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা পায়রা নদীতে।

পাথরঘাটা উপজেলার তাফালবাড়িয়া এলাকার কৃষক সুলতান হোসেন বলেন,বাঁধে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, কিন্তু জলোচ্ছ্বাসে মোগো ঘর ভাইসা যায়। প্রতি বছরই নতুন করে ঘর বানাই, আবার হারাই—আমাদের জীবনে শান্তি নাই।
তালতলী জয়ালভাঙ্গার আবদুল হালিম বলেন, মোরা বাঁধে ভরসা রাখি, কিন্তু বাঁধ মোগো রাখে না। জলোচ্ছ্বাসে সব ভেসে যায়, শুধু কান্নাই থাকে। প্রতিবার পানি আসলে বুক ধড়ফড় করে—বাচ্চাগুলারে নিয়ে কোথায় যামু, এই চিন্তায় ঘুম হয় না। বাঁধে কোটি কোটি টাকা খরচ হয় শুনি, কিন্তু মেরামতের নাম করে শুধু মাটি ফেলা হয়। জোয়ার এলেই সব ধুয়ে যায়।
বরগুনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান বলেন, এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে মেরামত করতে অন্তত ১০০ কোটি টাকা দরকার। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলে যে পরিমাণ বাঁধ প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই বরাদ্দ মেলে না। মানুষের ক্ষতি কমিয়ে আনতে নিয়মিত সংস্কার কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, এক হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা খরচে ১৩ কিলোমিটার বাঁধের তীর সংরক্ষণ, ৯ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ ও ৫১ কিলোমিটার অংশে এখন মেরামতের কাজ চলছে। আরও ৬৯ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, মেরামত ও নদী সংরক্ষণে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা দরকার। সেজন্য দুটি প্রকল্প পাঠানো হয়েছে। সেটি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। বাঁধের ঢালু থেকে মাটি কেটে মেরামতের সুযোগ নেই।