নদীভাঙন
মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম
প্রবা ফটো
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে পায়রা নদীর আকস্মিক ভাঙনে মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের পিপড়াখালী গ্রামের ৬টি পরিবারের বসতভিটা, একটি কবরস্থান ও একটি মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে একটি মসজিদসহ অন্তত ২০টি বসতবাড়ি। এ ঘটনায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী পরিবারগুলো। ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পিপড়াখালী গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা। গত মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হয়ে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। আকস্মিক এমন অব্যাহত ভাঙনের ফলে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে মির্জাগঞ্জ উপজেলার মানচিত্র।
পিপড়াখালী গ্রাম ছাড়াও উপজেলার রামপুর, ভিকাখালী, সুন্দ্রা কালিকাপুর, চিংগড়িয়া, হাজিখালী, গোলখালী, চরখালী, মেন্দিয়াবাদ ও কাকড়াবুনিয়া এলাকায়ও ভাঙন শুরু হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে নদীগর্ভে ভিটে মাটি হারানো পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছেন- আজিজ সিকদার, শাকিল সিকদার, জাহাঙ্গীর তালুকদার, মনির তালুকদার, উজ্জ্বল সিকদার, দুলাল আকন, নুর আলমসহ আরও অনেকে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পায়রা নদীর স্রোতের তীব্রতায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। বহু ঘরবাড়ি, গাছপালা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গৃহহীন পরিবারগুলো পাউবোর ওয়াপদা বেড়িবাঁধের পাশে ঝুপড়ি তুলে বসবাসের চেষ্টা করছেন। স্বর্বস্ব হারিয়ে ইতোমধ্যে কেউ কেউ পরিবার নিয়ে শহরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ভাঙনের আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্ন কবরস্থান ও আধাপাকা টিনশেড বাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।
একাধিকবার ভাঙনের শিকার স্থানীয় প্রবীন বাসিন্দা মো. মকবুল সিকদার জানান, আমি এইখানে ৬ বার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখেছি। ৩ বার বসতভিটা পাল্টিয়েছি। আমার মা-বাবা, দাদা-দাদীর কবরও এই পায়রা নদীতে চলে গেছে। মন চাইলেও কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য দোয়া করতে পারি না। গত ৬০ বছরে পায়রা নদীর ভাঙনে শত শত পরিবার বসতভিটা, আবাদি জমি, কবরস্থান, মসজিদ-মন্দির ও প্রাথমিক স্কুল বিলীন হয়ে গেছে। পরবর্তী প্রজন্ম শুনবে এখানে ‘পিপড়াখালী’ নামক একটি গ্রাম ছিল, যা তাদের কাছে শুধুই গল্প মনে হবে।
ভাঙনের শিকার হয়ে একাধিকবার বসতবাড়ী স্থানান্তরকারী আরেক বাসিন্দা মো. শাহজাহান হাওলাদার বলেন, দুইবার আমার বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন আবার ভাঙন শুরু হওয়ায় আতংকে কাঠের চৌচালা ঘরটি ভেঙ্গে নিয়ে বেড়িবাধেঁর ভিতরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। শেষ স্মৃতিচিহ্ন ছিল দুইটি আকাশমনি গাছ, তাও কেটে নিচ্ছি। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ২০ কাঠা পরিমাণ জমি মুহূর্তে নদীগর্ভে চলে গেছে। একটি মসজিদ আছে তাও মাত্র ২০ ফুট দুরত্বে রয়েছে। যে কোন সময়ে এ মসজিদটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
পিপড়াখালী গ্রাম সংলগ্ন পায়রা নদীর মাঝে বালু উত্তোলনকারী ৪টি বলগেট জাহাজ দেখিয়ে একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধীরে ধীরে এই গ্রামটি (পিপড়াখালী গ্রাম) নিশ্চিহ্ন হওয়ার মূল কারণ পিপড়াখালী গ্রামসংলগ্ন পূর্ব দিকে নদীর মাঝে জেগে ওঠা চর থেকে বিরতিহীনভাবে বালু উত্তোলন ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করা। বালু উত্তোলন বন্ধ না করে মাঝে মধ্যে শুধু কিছু বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। বালু উত্তোলন বন্ধ ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করলে অচিরেই পিপড়াখালী গ্রামটি মির্জাগঞ্জের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।
পিপড়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু সুজীদ মজুমদার জানান, বিদ্যালয়টি ছিল পায়রা নদীর তীরে। ভাঙনের কারণে একাাধিকবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়াতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, নদী ভাঙনের খবর শুনে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক এবং আমি পিঁপড়াখালী গ্রামের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব জানান, পায়রা নদীর প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। মির্জাগঞ্জের ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫ ইউনিয়নই পায়রা নদীতীরবর্তী। ফলে ভাঙনের তীব্রতাও বেশি এ এলাকায়। পিপড়াখালী এলাকায় ইতিমধ্যে ভাঙানরোধে প্রায় পাঁচ হাজার জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি এবং বিকল্প বাধঁ নির্মাণের কাজ চলছে। ভাঙন রোধে জরিপ চলমান, শেষ হলে শক্ত বাঁধ তৈরির একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।