গ্রামীণ নারী দিবস আজ
ওবাইদুল আকবর রুবেল, ফটিকছড়ি
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৩১ পিএম
ফটিকছড়ি পৌরসভার সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফিরোজা বেগম। প্রবা ফটো
আজ ১৫ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও জাতিসংঘের অন্যান্য সদস্য দেশের মতো বাংলাদেশ দিবসটি পালন করছে। অবমূল্যায়ন নয়, পরিবার ও সমাজে গ্রামীণ নারীর অবস্থান মূল্যায়ন করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গ্রামীণ নারীরা বিরাট অবদান রাখছেন। আজ আমরা তুলে ধরব এমনই একজন কৃতি নারীর গল্প, যিনি টানা ৩৩ বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নাম তার ফিরোজা বেগম। বয়স এখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়ই বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে আর স্বামীর সংসার করা সম্ভব হয়নি। এই আঘাতই বদলে দিয়েছে তার জীবন। শুরু হয়েছে মানব সেবার নতুন এক অধ্যায়ের। বাপের বাড়ি ফিরে মনস্থির করলেন সমাজ সেবায় বিলিয়ে দেবেন নিজেকে। তার অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে সব প্রতিকূলতা। সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ফিরোজা বেগম টানা ৩৩ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন জনপ্রতিনিধির। পথে-ঘাটে-অফিসে যে যেখানে সেবা নিতে আসে সাধ্যমত সেবা দিতে চেষ্টা করেন তিনি। স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞেস করতেই এক বাক্যে বলে ওঠেন, 'তার (ফিরোজা) মতো জনপ্রতিনিধি হয় না, তাকে সব সময় আমরা পাশে পাই।'
ফিরোজা বেগম চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত রশিদ আহমদ সওদাগর ও রশিদা খাতুন দম্পতির মেয়ে। ১৯৮৭সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরে চাকরি নিয়ে প্রথমে একটি মাতৃকেন্দ্রের সম্পাদক ও পরে মাঠকর্মীর দায়িত্ব পালন করেন। এক সময় তার মাথায় আসে, জনগণের সেবা করতে হলে জনপ্রতিনিধি হতে হবে। পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদে মহিলা সদস্য পদ সৃষ্টি হলে এলাকার লোকদের উৎসাহে ধুরং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে 'এ' ওয়ার্ডে (১, ২, ৩ ওয়ার্ড) সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রার্থী হন। ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গোলাপ ফুল প্রতীকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এরপর থেকে কখনও হারতে হয়নি তাকে। সেই থেকে চারবার ইউপি সংরক্ষিত সদস্য এবং তিনবার ফটিকছড়ি পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পাশাপাশি তিনি ফটিকছড়ি পৌরসভার তৃতীয়বারের মতো প্যানেল মেয়রের দায়িত্বও পালন করেন।
এ ছাড়া ধুরুং কেএম টেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি, আনোয়ার আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য, ফটিকছড়ি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সাবেক সদস্য, ফটিকছড়ি থানা মহিলা মেম্বার সমিতির সাবেক আহ্বায়ক, উপজেলা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য, ফটিকছড়ি উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ফটিকছড়ি পৌরসভা কিশোর-কিশোরী ক্লাবের সভাপতি, ফটিকছড়ি ক্রীড়া সংস্থার নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ফিরোজা বেগম। নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে চলা এই নারী ২০২৩ সালে উপজেলা পর্যায়ে পেয়েছেন জয়িতা সম্মাননা পুরষ্কার। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় পেয়েছেন সরকারি-বেসরকারি নানা সম্মান স্মারক।
সমাজসেবা ও জনপ্রতিনিধির দীর্ঘ যাত্রায় অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতাও মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। স্কুটি চালিয়ে জনপদের খবরাখবর ও রাস্তা মেরামতের কাজ দেখবাল করতে গিয়ে বিভিন্নজনের কটুকথা, তাচ্ছিল্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। রক্ষণশীল সমাজের তোপের মুখেও পড়তে হয়েছে বহুবার। কিন্তু কোনো কিছুকে পরোয়া না করে তিনি একাগ্রভাবে কাজ করে চলেছেন জনগণের সেবায়। আর এই দীর্ঘ যাত্রায় সব সময় পাশে পেয়েছেন পরিবারকে।
ফিরোজা বেগমের ভাই মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, জনগণকে সেবা দিতে আপাকে কোনোদিন অবহেলা করতে দেখিনি। যেকোনো দুর্যোগেই ছুটে যান তিনি। এলাকাবাসীর খবরাখবর নেন। সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন। আমাদের পুরো পরিবারকে তিনি এলাকাবাসীর সেবার কাজে ব্যবহার করান।
সংসার ও সুন্দর জীবনের চিন্তা বাদ দিয়ে কেন নিজেকে মানবসেবায় বিলিয়ে দিয়েছেন? এই প্রশ্নের জবাবে ফিরোজা বেগম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তার এমন সংকল্প ও কর্ম প্রেরণার মূল হলেন মাদার তেরেসা ও প্রিন্সেস ডায়ানা। তিনি সমাজকর্মে এই দুজনকে অনুসরণ করতেন ও করে যাচ্ছেন। দেশ ও দশের জন্য আজীবন কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে বলেন, 'মানুষের জন্য কিছু করতে পারার মধ্যে আত্মতৃপ্তি আছে।'