নেত্রকোণা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ১৯:৪৫ পিএম
আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ১৯:৪৭ পিএম
নেত্রকোণার মদনে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডি’র নির্মাণ করা নতুন পিচঢালা সড়কে বছর না যেতেই ফের প্রায় এক কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে আরসিসি ঢালাই নির্মাণ কাজ শুরু করে স্থানীয় পৌরসভা। এই কাজের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে স্থানীয় সাংবাদিকদের হাত কেটে নেওয়ার প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন পৌর বিএনপি সভাপতি কামরুজ্জামান চন্দন।
শুক্রবার (১০ অক্টোবর) বিকালে মদন পৌরসভার নতুন নির্মাণ করা ওই সড়কে সমাবেশ করে মাইকে সাংবাদিকদের হাত কেটে নেওয়ার হুমকি দেন তিনি। দৈনিক কালের কণ্ঠের আঞ্চলিক প্রতিনিধি ফয়েজ আহমেদ হৃদয়, যুগান্তর প্রতিনিধি তোফাজ্জল হোসেন ও দৈনিক আমার দেশ এর প্রতিনিধি নিজাম তালুকদারকে এই হুমকি দেয়া হয়।
এর আগে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের প্রতিনিধি নূরুল আলম তালুকদারের ছোট ভাই আব্দুল্লাহ আল রোমান বিএনপি নেতাকর্মীসহ সংবাদ প্রকাশের জেরে স্থানীয় লোকজন নিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ এনে মানববন্ধন করেন।
এদিকে, বিএনপির নেতার এমন হুমকির পর সাংবাদিক সমাজে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে স্থানীয় সাংবাদিকরা। তারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ হৃদয় বলেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে নিউজ করায় একটি সুবিধাবাদী মহল অনিয়মকে ঢাকতে আমাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করেছে। এ নিয়ে যদি সংবাদ প্রকাশ করি তাহলে আমাদের হাত কেটে নেওয়ার হুমকি দেন। প্রকাশ্যে এমন হুমকি দেওয়ার পর থেকে আমি পরিবার নিয়ে নিপত্তাহীনতায় ভুগছি। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করব।
হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে পৌর বিএনপি সভাপতি কামরুজ্জামান চন্দন বলেন, রাস্তার কাজ হচ্ছিল, সেখানে গিয়ে সাংবাদিকরা নাকি টাকা চেয়েছিল শুনেছি। নিউজ করার পরে অনেক মানুষ সমাগত হয়েছিল। তাদের শান্ত করতে হাত কেটে নেওয়ার বক্তব্যটি চলে এসেছে। এলাকার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এভাবে বলতে হয়েছে। এখন বুঝতে পেরেছি, এতটা বলা ঠিক হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মদন-কেন্দুয়া ইউজেড আর ভাটি মনোহরপুর ভায়া দেওয়ান বাজার সড়কের ৩ হাজার ৩৭০ মিটার সড়কটি ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণ করে এলজিইডি। ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। কাজটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন রাহাত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তথ্য অনুযায়ী সড়কটির ৩ বছরের ফিটনেস থাকার রয়েছে। কিন্তু একই বছরের জুলাই থেকে মদন পৌরসভা ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে একই সড়কের নির্মাণ কাজ শুরু করে। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করলে ক্ষেপে যায় স্থানীয় বিএনপির নেতারা। পরে তারা প্রতিবাদ সমাবেশ করে সাংবাদিকদের হাত কেটে নেওয়ার হুমকি দেন। এ সময় তাদের প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়া হয়।
মদন পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আইইউজিআইপি প্রকল্পের আওতায় মদন পল্লীবিদ্যুৎ সাব-স্টেশন থেকে জাহাঙ্গীরপুর ফাজিল মাদ্রাসা পর্যন্ত ৮০৫ মিটার সড়কের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। নির্মাণ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। কবির সিন্ডিকেট সেন্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছে। ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই কাজটি শুরু করে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই শেষ করার কথা রয়েছে। ২০২৪ সালে যে সড়কটি নির্মাণ হয়েছে, সেই সড়কটি পুনরায় নির্মাণ করে অর্থ নয়ছয় করার অভিযোগ তুলেন স্থানীয়রা।
পৌরসভা প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী সড়কটির প্রথমে বক্সকাটিং করে ১০ ইঞ্চি বালু ফেলে রোলার দিয়ে কমপেকশন করার কথা ছিল। পরে তাতে ৪ ইঞ্চি সিসি ঢালাই দিয়ে এরপর ৬ ইঞ্চি পরপর রড দিয়ে ৭ ইঞ্চি সিসি ঢালাই দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়কটির বক্সকাটিং ও বালু না দিয়ে পূর্বের পাকা সড়কের ওপর আরসিসি ঢালাই দিচ্ছে। স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হয়। পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, ৮০৫ মিটার এর স্থলে ১ হাজার ২০০ মিটার নির্মাণ করা হবে। এজন্য বক্সকাটিং এবং বালু ফেলার প্রয়োজন হচ্ছে না। কিন্তু ১ হাজার ২০০ মিটার সড়কের নির্মাণের কোনো এস্টিমেট না থাকলেও প্রায় ৬০ ভাগ কাজ বাস্তবায়ন করেছেন বলে ঠিকাদার সূত্র জানায়।
এ বিষয়ে মদন পৌরসভার প্রশাসক (ইউএনও) এ বিষয়ে মো. অলিদুজ্জামান বলেন, এলজিইডি সড়কটি নির্মাণের সময় পৌরসভার লিখিত অনুমতি নেয়নি। প্রকল্পটি আগে থেকেই দেওয়া ছিল। সড়কটি নির্মাণের জন্য স্থানীয় লোকজন নিয়ে একাধিক মিটিং করেছি। সবার মতামতের ভিত্তিতে কাজ করা হচ্ছে।