সাইফুল হক মোল্লা দুলু,মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:৪৪ পিএম
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:৪৬ পিএম
কিশোরগঞ্জ জজ কোর্টে ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করেন মো. সাইফুল ইসলাম। কোর্টের চাকরির প্রভাব খাটিয়ে দখলবাজি ও মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অবৈধভাবে দখল করেছেন এলাকার অনেকের জমি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এলাকার অন্তত ৩৫ জনকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন। আর এসব মামলার বেশির ভাগের বাদী করা হয়েছে সাইফুলের স্ত্রী, বোন এবং শ্যালিকাকে। শুধু তাই নয়, তার এমন অত্যাচার থেকে বাদ পড়েনি পরিবারের সদস্যরাও। সাইফুলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা সাক্ষ্য দেওয়া লোকজনকেও করা হয়েছে বিভিন্ন মামলার আসামি।
জানা যায়, ১৯৯৬ সালে ড্রাইভার পদে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন সাইফুল। ২০০০ সালে তার পারিবারিক একটি বিরোধ মেটাতে যান তৎকালীন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন ব্যক্তি। সালিশের সিদ্ধান্ত তার পক্ষে না যাওয়ায় ওই সময়েই সালিশান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই বাড়িঘরে হামলার অভিযোগ এনে ঠুকে দেন মামলা। এখান থেকেই মামলাবাজি শুরু হয় সাইফুলের। এরপর সহোদর ভাই সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৯টি এবং সৎ ভাগ্নে খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করেছেন ১০টি মামলা। বেশিরভাগ মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাসও পেয়েছেন তারা।
আবার জায়গা-জমির বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠিয়ে সেই জমি দখল করে নিয়েছেন সাইফুল। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী খাইরুল ইসলাম। এলাকাবাসীর উদ্যোগে মানববন্ধনও করা হয়। এসবেও কোনো প্রতিকার পায়নি অসহায় পরিবারটি। তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মুসলিমপাড়া গ্রামে।
সাইফুলের সৎ বোন বিধবা ছালেহা বেগম অভিযোগ করে বলেন, সাইফুল আমার পৈতৃক সম্পত্তি জোর করে দখল করতে চায়। সম্পত্তি দিতে রাজি না হওয়ায় আমার ছেলে ও মেয়ের জামাইকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেল খাটিয়েছে। সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমার জায়গা দখল করেছেন। আমার ওপর অনেক নির্যাতন করেছে। সে জজ কোর্টে চাকরি করে। সেই ক্ষমতায় বহু বছর ধরে এভাবে নির্যাতন করতেছে। আমি আমার জমি ফেরত চাই।
খায়রুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, আমার মামা সাইফুল জোর করে জমি দখল করে রেখেছে। তার ভয়ে এলাকায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায়না। আমার নামে একের পর এক মামলা দিচ্ছে। আমি এর বিচার চেয়ে পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি। আমি ন্যায় বিচার চাই।
সাইফুলের সৎ ভাগ্নে নাসির উদ্দিন বলেন, মামার অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গেলে তার বিরুদ্ধে মামলা করে। এসব মামলায় বাদি করা হয় সাইফুলের স্ত্রী, বোন, শ্যালীকাকে। সে প্রায় অর্ধশতক মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানি করেছে। তাই মানুষ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও সাহস করে না। আমরা এর ন্যায় বিচার চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, খায়রুল ইসলামের জায়গা তার নামে খারিজ করা। বৈধ কাগজপত্রও আছে। সেই জায়গা দখলে নিয়ে গেছে মামা সাইফুল। সাইফুল জেলা জজ কোর্টে চাকরি করে। সেই ক্ষমতা খাটিয়ে আমার বাবা-চাচাসহ যারা সালিশে উপস্থিত ছিল তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। মানুষ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়। কথা বললেই মামলার হুমকি দেয়, পুলিশ দিয়ে হয়রানি করে।
সাইফুল ইসলামের ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিদেশ থেকে ফেরার পর সম্পদের ভাগ চাইলে আমার নামে একাধিক মিথ্যা মামলা করে। গত ৪ বছরে আমার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা করেছে। মাদক, অপহরণ, শ্লীলতাহানির মতো মামলা হয়েছে আমার নামে। প্রতি বছর ৩-৪ বার করে জেল খাটতে হয়। প্রতি মাসে ৫-৬টি হাজিরা দিতে হত। আমার ভাগের জমির প্রাপ্য অংশ আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ জজ কোর্টের ড্রাইভার মো. সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। আমি সবসময় ব্যস্ত থাকি। তবে তার স্ত্রী ও বোন কখন কার বিরুদ্ধে কয়টা মামলা করেছেন, এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন তিনি।
সাইফুল আরও বলেন, কাজের চাপে খুব একটা বাড়িতে যেতে পারিনা। মাঝে মাঝে গেলেও কিছুক্ষণ থেকেই শহরে চলে আসি। এই সময়ের মধ্যে কাউকে কিছু করাও সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সামাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম রতনের সঙ্গে কথা হলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, যদি কোনো ব্যক্তি কারও বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা করে। আর সেই মামলা যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে মানহানি, ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলা করতে পারেন।