রাসেল আহমদ, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৭ এএম
গহীন টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে একচিলতে ভিটের ওপর নাজমা খাতুনের দোচালা টিনের ঘর। প্রবা ফটো
চারদিকে বিস্তৃত হাওরের জলরাশি। ওপরে নীল আকাশের ক্যানভাস। অথৈ জলের মাঝখানে দোচালা একটি ঘর। শহরের কোলাহল, গ্রামীণ হট্টগোল কিংবা উৎসবের রঙিন ছোঁয়া এখানে নেই। আছে শুধু হাওরের ঢেউয়ের তালে তালে টিকে থাকার সংগ্রাম, আর মা-ছেলের অটুট ভালোবাসার গল্প।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের রংচী গ্রামের প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গহীন টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে একচিলতে ভিটের ওপর দোচালা টিনের ঘরে বাস করেন নাজমা খাতুন (৫৬) ও তার একমাত্র ছেলে অসার মিয়া (৩৪)।
বছরের বেশিরভাগ সময়ই ছেলে বাড়ির বাইরে থাকেন। জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দিনমজুরের কাজ করেন। ফলে হাওরের মাঝে এই বিচ্ছিন্ন বাড়িতে একাই থাকতে হয় নাজমাকে।
নাজমার জীবনযুদ্ধ শুরু স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের পর। তখন এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে হাওরের জীবিকার কষ্টসাধ্য পথে পা বাড়াতে হয় তাকে। কখনো মাছ ধরে, কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করে বড় করেছেন সন্তানদের। বছর খানেক আগে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন তার ভরসা একমাত্র ছেলে অসার মিয়া।
নাজমা খাতুন বলেন, ‘হাওরের মাঝে আমার বাড়ি। চলাফেরায় অনেক কষ্ট হয়। নেই বিদ্যুতের সংযোগ। মেঘ-বৃষ্টির রাতে অন্ধকারে সাপ-বিচ্ছু উঠে আসে ঘরে। ছেলে কামাই-রুজির জন্য বাড়ির বাইরে চলে যায়। তাই হঠাৎ কোনো অসুখে-বিসুখে ডাক্তার দেখানোরও উপায় নেই। অসুস্থ হয়ে দিনের পর দিন পড়ে থাকলেও দেখার কেউ থাকে না।’
নাজমার ছেলে অসার মিয়া বলেন, ‘বাড়িতে আমার বেশি থাকা হয় না। কাজের জন্য দূরে যেতে হয়। বাজারও অনেক দূরে, তাই আমি মাসের হাট (কেনাকাটা) একসঙ্গে করে রেখে যাই। সম্প্রতি ঋণ করে একটা সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি, যাতে মা অন্তত রাতে আলো পায়।’
নাজমার এই ঘরে বছরের দুই ঈদ বা পিঠা-পার্বণের আনন্দ উঁকি দেয় না। নেই আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা, কোলাহল। বরং প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে আছে নির্জনতা আর অনিশ্চয়তা। তার এই ঘর যেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের জেলেপল্লীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবিÑ যেখানে জীবনের প্রতিটি দিনই সংগ্রামের, আর স্বপ্নগুলো ভাসে হাওরের ঢেউয়ের সঙ্গে। তবুও মা-ছেলে হাল ছাড়েননি। বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওরের জলরাশি আর প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই রচিত হচ্ছে তাদের জলেভাসা জীবনের গল্প।
বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আমানুউল্লাহ বলেন, ‘গত বছর বন্যা ও ঝড়ে নাজমা খাতুনের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারিভাবে ১০ হাজার টাকা সহায়তা দিয়েছি। হাওরের এই পরিবারের প্রতি আমাদের নজর আছে।’
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, ‘নাজমা খাতুনের খোঁজ নিয়ে তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।’