দিলীপ মজুমদার, কুমিল্লা
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৫৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার শুহিলপুর ও বাতাঘাসী ইউনিয়নজুড়ে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলছে ফসলি জমিতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলন। জমির মালিক ও ড্রেজার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি স্কয়ারফুটে কমিশন আদায়ও করা হচ্ছে। রাতদিন চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন রয়েছে চুপ। এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই। সরকারি খাল দখল করে বসতবাড়ি বানানোর অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। বিষয়টি প্রশাসন জানলেও রয়েছে শীতঘুমে। ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিবেশ ও কৃষিজমি হুমকির মুখে বলে জানান স্থানীয়রা।
এলাকার একাধিক সূত্র জানায়, বালু ও কৃষিজমির মাটি তুলে তা দিয়ে জমি ভরাটের কাজ করছেন শুহিলপুর ইউনিয়নের বশিকপুর গ্রামের সাবেক মেম্বার আকবর মোল্লা। তিনি নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের বড় নেতার পরিচয়ের আড়ালে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন এবং কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ।
মেম্বার আকবরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করার কথা বলে জমির প্রতি স্কয়ারফুট থেকে ড্রেজার ব্যবসায়ী ও জমি ভরাট মালিকদের কাছ থেকে দেড় থেকে ২ টাকা করে কমিশন আদায় করছেন।
বালু উত্তোলন ও কৃষিজমির মাটি কাটার সরকারি কোনো অনুমতি না থাকলেও তিনিই অনুমতি দিচ্ছেন। তার কাছ থেকেই ড্রেজার মেশিন চালানোর অনুমতি নিতে হচ্ছে বলে অভিয়োগ। তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতায় দিনরাত ধরে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। সরকারি জায়গা দখল করে তা ভরাট করা হচ্ছে। এতে তৈরি করা হচ্ছে স্থাপনা। এর ফলে পরিবেশ ও কৃষিজমি মারাত্মক হুমকি পড়েছে।
এ ব্যাপারটি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আনা হলেও প্রশাসন আইনি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তবে প্রশাসন কয় বার অভিযান চালিয়ে ড্রেজার মেশিন ও বালু উত্তোলনের পাইপ ধ্বংস করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত জড়িত কাউকে আটক অথবা জরিমানা করেনি।
এলাকাবাসী মনে করে, প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান শুধু লোক-দেখানো। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় থানা সব জায়গাতেই এক ধরনের নীরবতা। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক স্থানীয় কয় জন জানান, বশিকপুর গ্রামের ‘প্রধান বাড়ির’ হোসেন প্রধান ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নিজের জমির সঙ্গে সংযুক্ত সরকারি খালও ভরাট করে ফেলেছেন। এ নিয়ে স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন হলেও আকবর মোল্লার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। তারা আরও বলেন, আমরা জানি খাল ভরাট করা হলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। ফসল নষ্ট হবে। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তবে এর বিরুদ্ধে কথা বললে আমাদের কঠিন অবস্থার মুখে পড়তে হবে।
মেম্বার আকবর মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে খাল ভরাট কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তাই এলাকার মানুষ সাহস করে কিছু বলতে পারছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয় জন ড্রেজার ব্যবসায়ী বলেন, এখানে যারা কাজ করছে, তারা সবাই জানেন কমিশন না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে। জমিতে বালু উত্তোলনের জন্য মেম্বর আকবরকে কমিশন দিতে হচ্ছে। কমিশন না দিলে ড্রেজার বন্ধ করে দেবেন। তিনি একটি দলের বড় নেতা বলে পরিচয় দেন।
বিল্লাল নামের এক ড্রেজার ব্যবসায়ী বলেন, আমি ড্রেজার মেশিন বসানোর সময় তিনি (মেম্বর আকবর মোল্লা) কাজে বাধা দেন। কাজ করতে হলে প্রশাসনকে টাকা দিতে হয়, এ কথা বলে প্রথমে আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের নাম করে আরও ৪০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু এরপরও প্রশাসন অভিযান চালিয়ে আমার ড্রেজার মেশিন ও পাইপ ভেঙে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আকবর মোল্লা বলেন, কেউ আমার বিরুদ্ধে কিছু বললেই কি তা সত্য হবে নাকি? আমি টাকা নেই, এটা মিথ্যা কথা। এ ব্যাপারে চান্দিনা উপজেলা ইউএনও আশরাফুল হক বলেন, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে কেউ টাকা নিলে তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রশাসনের কথা বললেই কেন টাকা দিতে হবে।