বিএসসি-ডিপ্লোমা পাল্টাপাল্টি
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২১:০৪ পিএম
বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমাধারী ব্যক্তিদের দ্বন্দ্ব নিরসনে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটির সুপারিশ না আসা পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এর আগে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে চার ঘণ্টারও বেশি সময় অবরোধ শেষে সড়ক ছাড়েন কারিগরির শিক্ষার্থীরা। প্রয়োজনে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।
এদিকে সাত দফা দাবির সমর্থনে এবং বিএসসি প্রকৌশলীদের তিন দফার প্রতিবাদে বুধবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা। তারা সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও একাত্মতা প্রকাশ করেন।
বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এক সভায় বিএসসি ও ডিপ্লোমাধারী ব্যক্তিদের দ্বন্দ্ব নিরসনে কমিটি গঠন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনরত দুই পক্ষের দাবিগুলো খানিকটা পরস্পরবিরোধী। একজনেরটা গ্রহণ করলে আরেকজন অসন্তুষ্ট হবেন, অন্যজনেরটা গ্রহণ করলে আরেকজন অসন্তুষ্ট হবেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে একটা সেতু গড়ে তোলা যায়, সেই চেষ্টা করেছি। পরামর্শের ভিত্তিতে একটি ৬ সদস্যের কমিটি করেছি। এ কমিটি কাজ করবে যাতে দুই পক্ষের মধ্যে একটা সেতু গড়া যায়। পরস্পরবিরোধী বিষয়গুলো নিয়ে কীভাবে একমত হওয়া যায়।’
ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষসহ প্রকৌশলীদের দুটি পক্ষের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা সভায় উপস্থিত ছিলেন। মোট ৬০ জন এসেছিলেন। উনারা এটাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ওই কমিটির সুপারিশ না আসা পর্যন্ত তারা আর কোনো আন্দোলন করবেন না। রাস্তাঘাটে জনদুর্ভোগ হয়, এ রকম কোনো কাজেও উনারা লিপ্ত হবেন না।’
আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা
চার ঘণ্টারও বেশি সময় অবরোধ শেষে সড়ক ছাড়েন কারিগরির শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে প্রয়োজনে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা। বুধবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান কারিগরি ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি মো. মাশফিক ইসলাম। তিনি বলেন, দেশের সব পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আজ (বুধবার) নিজ নিজ জেলায় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান, বিক্ষোভ ও ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে। বৃহস্পতিবার (আজ) শিক্ষার্থীরা ‘কাকতাড়ুয়া দহন কর্মসূচি’ পালন করবে। এর মাধ্যমে বিএসসি শিক্ষার্থীদের অযৌক্তিক তিন দফা দাবির কবর রচনা করা হবে।
মাশফিক আরও বলেন, প্রয়োজনে সারাদেশে কঠোর থেকে কঠোরতম আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে এবং অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হবে।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ
উপসহকারী প্রকৌশলী পদ নিয়ে ষড়যন্ত্র ও বিএসসি প্রকৌশলীদের তিন দফার প্রতিবাদে গাজীপুরে চন্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। এতে ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডুয়েট এলাকা থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। পরে বিশাল মিছিল নিয়ে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় এসে দুপুর সোয়া একটার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, দেশের ৪০ লক্ষাধিক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও প্রায় চার লাখ পলিটেকনিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা যে তিন দফা দাবি উত্থাপন করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় প্রকৌশলী ইসহাক পিকু বলেন, আমরা সাত দফা কর্মসূচি দিয়েছি, কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমাদের যৌক্তিক দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ
সাত দফা দাবির সমর্থনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে কারিগরি ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ। বুধবার দুপুরে বরিশাল পলিটেকনিকের সামনে শিক্ষার্থীরা এ অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সড়ক অবরোধ থাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
কারিগরি ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজুল আলম মিঠু বলেন, ‘সাত দফা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
রংপুরে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের গুলি করে হত্যার হুমকির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরা। কারিগরি ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বুধবার বেলা ১২টায় রংপুর পলিটেকনিক ক্যাম্পাস থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এরপর শাপলা চত্বরে সড়ক অবরোধ করে ঘন্টাব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তারা।
বগুড়ায় সড়ক অবরোধে যানজট
গুলি করে হত্যার হুমকি এবং বিএসসি প্রকৌশলীদের তিন দফা অযৌক্তিক দাবি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বগুড়া পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে ইনস্টিটিউট গেট থেকে মিছিল নিয়ে বনানী লিচুতলা মোড়ে গিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়লে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পরে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। বিক্ষোভ শেষে শিক্ষার্থীরা বৃহস্পতিবার নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তারা জানান, আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) ‘কাকতাড়ুয়া দহন কর্মসূচি’ পালন করা হবে।
নওগাঁয় অবস্থান কর্মসূচি
ডিগ্রি প্রকৌশলীদের অযৌক্তিক তিন দফা দাবি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রত্যাখ্যানের দাবিতে নওগাঁয় বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার দুপুরে শহরের মুক্তির মোড় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে নওগাঁর সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের আয়োজনে এ কর্মসূচিতে অংশ নেন শিক্ষার্থীরা।
দিনাজপুরে রেলপথ ও সড়ক অবরোধ
বুধবার সকালে কারিগরি ছাত্র আন্দোলন দিনাজপুর পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা শহরের ফুলবাড়ী নীমনগর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রেলপথ ও সড়ক অবরোধ করেছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন শহরের অন্যান্য পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা। এর ফলে শত শত যানবাহন আটকে পড়ে। শহরজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন পথচারীরা। রেলপথে অবস্থানের কারণে আটকা পড়ে পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী দ্রুতযান এক্সপ্রেস ও রাজশাহীগামী বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস ট্রেন। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেন। পরে ট্রেন দুটি গন্তব্যস্থলে রওনা দেয়।
ফেনীতে রেল অবরোধ, ভোগান্তি
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ফেনীতে অবরোধ করেছেন কারিগরী শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে শহরের গোডাউন কোয়ার্টার রেলক্রসিং এলাকায় এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। এ সময় ট্রেন ও সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন সড়কে চলাচল করা মানুষজন। এ সময় বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুর ১টার দিকে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে নেন।
টাঙ্গাইলে মহাসড়ক অবরোধ
বিএসসি ডিগ্রিধারীদের অযৌক্তিত তিন দফা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রত্যাখ্যান দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক অবরোধ করেছেন টাঙ্গাইল পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুর ১২টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত রাবনা বাইপাসে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে এলেঙ্গা থেকে করটিয়া পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন এ সড়ক যাতায়াতকারীরা। পরে সেনা সদস্যরা শিক্ষার্থীদের অবরোধ তুলে নিতে বলায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেন শিক্ষার্থীরা।
নরসিংদীতে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ
কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস ও প্রকৌশল কর্মক্ষেত্র কুক্ষিগত করার প্রতিবাদে এবং চার দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে নরসিংদীতে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কারিগরি শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে নরসিংদী পলিটেকনিক থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পুলিশ লাইন্স এলাকায় ঢাকা সিলেট মহাসড়কে এসে জড়ো হন তারা। পড়ে মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। এর আগে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করে নিজেদের দাবি পেশ করেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মহাসড়কের দুই পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।