× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাজেকে স্বপ্নভ্রমণেই থেমে গেল রিংকীর জীবন

খুলনা অফিস

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৭:২৯ পিএম

সাজেকে স্বপ্নভ্রমণেই থেমে গেল রিংকীর জীবন

সাজেকের পাহাড়ি পথ ধরে ছুটছিল চান্দের গাড়ি। চেহারায় পাহাড় দেখতে যাওয়ার উচ্ছ্বাস, চোখে স্বপ্নের ঝিলিকÑ সামনের দিনগুলো আরও সুন্দর হবে, প্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্য হয়তো সেই স্বপ্নকেই আরও দৃঢ় করে তুলবে। কিন্তু হঠাৎই সবকিছু থেমে যায়। গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে যায়। মুহূর্তেই চিৎকার, কান্না আর আতঙ্কের শব্দে পাহাড় কেঁপে ওঠে। এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী মোছা. রুবিনা আফসানা রিংকী (২১)। আহত হন শিক্ষকসহ আরও ১১ জন।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে রওনা হন পদার্থবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এটি ছিল তাদের বহুদিনের প্রতীক্ষিত সেশনাল ট্যুর। ৩৮ জন শিক্ষার্থী, চারজন শিক্ষক ও দুজন সাপোর্টিং স্টাফ নিয়ে দলটি সাজেকের উদ্দেশে যাত্রা করে। সবার চোখে পাহাড় দেখার স্বপ্ন, মনে ছিল বন্ধুত্ব আর শেখার আনন্দ।

ট্যুরে থাকা শিক্ষার্থীদের ভাষায়, আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারিনি, এই ভ্রমণ এমন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। হাসতে হাসতে ছবি তুলছিলাম সবাই। ঠিক তখনই একটা গাড়ি পিছলে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়, মুহূর্তেই খাদে পড়ে যায়। এরপর যা ঘটেছে, তা মনে করলেও গা শিউরে ওঠে।

দুর্ঘটনার সময় ওই চান্দের গাড়িতে ছিলেন একজন শিক্ষক ও ১১ শিক্ষার্থী। বাকিরা অন্য গাড়িতে ছিলেন। দুর্ঘটনায় রিংকী ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। তার পাশের সিটে বসা সহপাঠীরা গুরুতর আহত হন। দ্রুত স্থানীয়রা ও অন্য শিক্ষার্থীরা ছুটে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করেন এবং পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে পাঠান।

রুবিনা আফসানা রিংকী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোমরপুর গ্রামের শিক্ষক দম্পতি আব্দুর রহমান ও জান্নাতুল ফেরদৌসের একমাত্র কন্যা। ছিলেন মেধাবী, শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজিতা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি, আইডি নম্বর ছিল ২১১৭১৬।

সহপাঠীরা জানান, রিংকী ছিলেন হাসিখুশি ও বন্ধুবৎসল। সবসময় সহপাঠীদের সহযোগিতা করতেন, বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে তার ছিল প্রবল আগ্রহ। ডিসিপ্লিনের বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমেও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

রিংকীর এক ঘনিষ্ঠ সহচর আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, ‘রিংকী আপু সব সময় বলতেনÑ আমরা একদিন গবেষক হবো, পৃথিবী বদলে দেবো। ভাবতেই পারছি না, তিনি আর আমাদের মাঝে নেই।’

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। ক্লাসরুম, ল্যাবরেটরি, হলের করিডরÑ সবখানে কান্না ও শোকাবহ নীরবতা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রশাসনের কর্মকর্তাÑ সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়েন এই মর্মান্তিক ঘটনায়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খাগড়াছড়ি সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা রুবিনা আফসানা রিংকীর অকাল মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। তিনি ছিলেন, আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। আমরা তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং আহত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দ্রুত আরোগ্যের জন্য সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।’

রিংকীর মৃত্যুতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদসহ সকল উপাসনালয়ে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের এই দোয়ায় অংশ নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অপরাজিতা হলের সহপাঠীরা জানান, তারা হলে রিংকীর রুমটি এখনো তালাবদ্ধ রেখেছেন। রিংকীর ব্যবহৃত খাতা, বই, ব্যাগÑ সবকিছু যেন তার উপস্থিতির নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে আছে।

এই দুর্ঘটনা আবারও পাহাড়ি পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা ইস্যুতে প্রশ্ন তুলেছে। সাজেকগামী আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু সড়কগুলোতে প্রতিদিনই অসংখ্য চান্দের গাড়ি ছুটে চলে। বর্ষার মৌসুমে এসব সড়ক আরও পিচ্ছিল হয়ে পড়ে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

খাগড়াছড়ি জেলা বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আমেনা মারজান জানান, আমরা দুর্ঘটনার খবর পাওয়ামাত্র উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছি। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে পাহাড়ি সড়কে যানবাহন চলাচলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রিংকীর স্বপ্ন ছিল একজন বিজ্ঞানী হওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে ল্যাব কোট পরে পরীক্ষানিরীক্ষায় মগ্ন থাকতেন তিনি। শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছার কথাও প্রায়ই বলতেন। অথচ সেই স্বপ্ন, সেই সম্ভাবনা আজ পাহাড়ের গহ্বরে থেমে গেছে।

রিংকীর শিক্ষকরা বলেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অগাধ। তাঁর মতো শিক্ষার্থী হারানো আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতের ট্যুর বা ফিল্ড ট্রিপগুলোতে নিরাপত্তা নির্দেশিকা আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার রিংকীর আত্মার শান্তি ও আহতদের সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছে।

একটি ভ্রমণ—যা হওয়ার কথা ছিল আনন্দের, সেটিই আজ শোকের স্মৃতি হয়ে রইল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের মনে। রিংকীর না ফেরা, পাহাড়ি পথে হারিয়ে যাওয়া এক স্বপ্ন—স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে নিরাপদ ভ্রমণের গুরুত্ব আর জীবনের অনিশ্চয়তাকে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা