হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১৩:১২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
জুন মাসের মাঝামাঝিতে ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ পাম অয়েল বিক্রি হয়েছিল ৫ হাজার ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। গত বৃহস্পতিবার ওই তেল বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ৯৫০ থেকে ৬ হাজার টাকায়। গত আড়াই মাসের ব্যবধানে পাইকারিতে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ৩৫০ টাকা। কেজিতে দাম বেড়েছে অন্তত ৯ টাকা। সম্প্রতি সরকার পাম অয়েলের দাম কমালেও তার প্রভাব পড়েনি খাতুনগঞ্জে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় গত ১২ আগস্ট দেশের বাজারে পাম অয়েলের দাম কমিয়েছে সরকার। ১৯ টাকা কমিয়ে প্রতি লিটারের দাম ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এই দামে এখনও বাজারে মিলছে না পামঅয়েল। খাতুনগঞ্জে এখন প্রতি লিটার পামঅয়েল বিক্রি হচ্ছে ১৫৯ টাকায়।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণেই খাতুনগঞ্জে ধারাবাহিকভাবে পাম অয়েল তেলের দাম বাড়ছে।
একই কারণে খাতুনগঞ্জে বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। জুন মাসের মাঝামাঝিতে যেখানে প্রতি মণ সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছিল ৬ হাজার ৪০০ টাকায়। সেখানে এখন প্রতি মণ সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায়।
ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে দাবি করলেও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে যেই হারে দাম বাড়ে তার চেয়ে বেশি বাড়ে খাতুনগঞ্জে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও তার প্রভাবও খাতুনগঞ্জে সঙ্গে সঙ্গে পড়ে না।
ট্রেডিং ইকোনমিক্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন পাম অয়েল বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ৯০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৫১ টাকা (এর পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে থাকে পাম অয়েলের দাম। গত ২৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন পামঅয়েল বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৫ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৯৫৬ টাকা।
সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বিজনেস ইনসাইডার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছিল ১ দশমিক ২৩ ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪৯ টাকায়। এরপর গত ২৯ আগস্ট প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হয় ১ দশমিক ১২ ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা কমলেও খাতুনগঞ্জে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। পাম অয়েলের পাশাপাশি বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম।
খাতুনগঞ্জের সাব্বির ট্রেডিংয়ের পরিচালক সৈয়দ সাব্বির আহমদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বুকিং রেট অনুযায়ী খাতুনগঞ্জে পামঅয়েল এবং সয়াবিন তেল বেচাকেনা হয়।’
সরকার দাম কমানোর পর কেন পাম অয়েলের দাম কমছে নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভোজ্যতেলের দাম কমিয়ে আনতে হলে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে যেই ফর্মুলা সরকার গ্রহণ করেছে, এ ক্ষেত্রেও একই ফর্মুলা গ্রহণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু আমদানিকারক এবং মিলমালিকের হাতে ভোজ্যতেলের বাজার ছেড়ে না দিয়ে, সাধারণ ব্যবসায়ীদের পরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে সুযোগ দিতে হবে। সবাই যখন ভোজ্যতেল আমদানির সুযোগ পাবে তখন, চিনির মতো পাম অয়েল, সয়াবিন তেলের দামও কমে যাবে।’
ভোজ্যতেল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গুটি কয়েক আমদানিকারক ও মিলমালিক ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। ঘুরেফিরে এসব প্রতিষ্ঠানই পাম অয়েল, সয়াবিন তেল আমদানি করে বাজারজাত করছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠান ভোজ্যতেল আমদানি করে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করে বড় বড় কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড, তীর ব্র্যান্ডের মালিক সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড, ফ্রেশ ব্র্যান্ডের মালিক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি, পুষ্টি ব্র্যান্ডের মালিক টিকে গ্রুপ, শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রি, সোনারগাঁও সিডস ক্রাশিং মিলস লিমিটেড, সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড ও স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যাদের মিল আছে এখন শুধুমাত্র তারাই পাম অয়েল এবং সয়াবিন তেল আমদানি করে। তাই সরকার যদি চিনির মতো পরিশোধিত পাম অয়েল এবং সয়াবিন তেল আমদানির সুযোগ অবারিত করে দেয়, তাহলে তেলের বাজারও নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।’