বাগেরহাট প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৫ ১২:১১ পিএম
১৩৭ বছরের গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে সপ্তাহে দুই দিন এখনও বসে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার টাউন নোয়াপাড়ার পানের হাট। প্রবা ফটো
১৩৭ বছরের গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার টাউন নোয়াপাড়ার পানের হাট দেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ হাট হিসেবে পরিচিত। সপ্তাহে দুই দিন বৃহস্পতিবার ও রবিবার ভোর ৪টায় শুরু হওয়া এই হাটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। প্রতিটি হাটে কোটি টাকার ওপরে বাণিজ্য হলেও, অবকাঠামো ও সুবিধার অভাবে ক্রমেই দুর্দশার চিত্র প্রকট হয়ে উঠছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাট শুরু হয় ভোর ৪টায়, যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে, তখন কলার পাতায় মোড়ানো পানের গাদা মাথায়, কাঁধে কিংবা সাইকেলে করে হাটে হাজির হন চাষিরা। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে হাজারো মানুষের কেনাবেচা চলে। কেউ দরদাম করছেন, কেউ আঁটি বেছে নিচ্ছেন, আবার কেউ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর জন্য ট্রাকে পানের গাঁদা তুলছেন। প্রতি হাটে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খাজনা আদায় করা হয়। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এ হাটে আসেন। এখানকার পান শুধু দেশের নানা জেলায় নয়, রপ্তানি হয় বিদেশেও।
পানের হাটে কোটি টাকার লেনদেন হলেও নেই ন্যূনতম অবকাঠামো। নেই ছাউনি, নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা বা শৌচাগার। বর্ষাকালে হাটের রাস্তায় পানি জমে, কাদা ও জলাবদ্ধতায় চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, হাটসংলগ্ন মসজিদের টয়লেট তালাবদ্ধ থাকে। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক।
বাজারে পানের সরবরাহ থাকলেও নেই ক্রেতার সেই ভিড়। মোল্লাহাট থেকে আসা চাষি রহিম শেখ বলেন, ভোর ৪টায় এসেছি, এখন ৬টা বাজেÑ তবুও বিক্রি করতে পারিনি। দুই পোন পান নিয়ে এসেছিলাম, বিক্রি করলে ৮০০ টাকা পাব। কিন্তু ভ্যান ভাড়া আর খরচ দিয়েই সব শেষ।
রূপসার নৈহাটি থেকে আসা সালাম বললেন, আজকের দিনে চাষিকে কেউই গুরুত্ব দেয় না। আমরা রোদে পড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ফলাই, কিন্তু ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় হতাশ। অনেক চাষি আছে যারা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। একজন লেবার নিতে গেলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা খরচ হয়। এই খরচেই আমরা পানের চাষ করি। কিন্তু বাজারে এসে দেখছি বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানে পড়তে হচ্ছে।
পানচাষি সরদার কামরুল ইসলাম বলেন, এই পান চাষ করেই জীবিকা চলে, কিন্তু বাজার যদি একটু ভালো হতো হয়তো ছেলেমেয়ে নিয়ে দু’মুঠো ভাত খেতে পারতাম। আব্দুল করিম বলেন, আগে এক গাদা পান বিক্রি করে সংসার চালানো যেত, এখন সেই দামে লেবারের মজুরিও ওঠে না। মিজানুর রহমান বলেন, সুপারির দাম বেড়েছে কিন্তু পানের দাম দিন দিন পড়ছে।
হাটের ইজারাদার মো. তাজুল ইসলাম বলেন, আমি গত ৩৩ বছর ধরে এই হাট পরিচালনা করছি। প্রতি বছর সরকারকে ১৫-১৬ লাখ টাকা ইজারা দেই। সপ্তাহে দুই দিন বৃহস্পতিবার ও রবিবার হাট বসে। প্রতি হাটেই প্রায় কোটি টাকার পানের বেচাকেনা হয়। কিন্তু এই কোটি টাকার হাটে কোনো উন্নয়ন হয়নি। ছাউনিগুলো জরাজীর্ণ, বৃষ্টিতে পানি জমে, বাথরুম নেই, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও নেই। এমনকি মসজিদের বাথরুমটাও তালা দেওয়া থাকে, ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, পানের বাজারমূল্য দিন দিন কমায় এক সময়কার লাভজনক এই চাষ এখন অনেকের জন্য লোকসানে পরিণত হয়েছে। সুপারি বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় তার প্রভাবেও পানের দাম অনেকটা পড়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে পানচাষিদের টিকে থাকায় দায় হয়ে পড়বে।
ফকিরহাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমনা আইরিন বলেন, আমি মাত্র ছয় মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। এত বড় একটি পানের হাট আছেÑ এ তথ্য আমার জানা ছিল না। তবে সম্প্রতি বিষয়টি জানতে পেরেছি। দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে হাটবাজার উন্নয়ন ফান্ড থেকে প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।