লালমনিরহাট প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৩৩ এএম
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৩৪ এএম
প্রবা ফটো
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ তিস্তা তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। নদীর স্রোতের তীব্রতা ও পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় সেতু, বাঁধ, সড়ক ও হাজারো পরিবারের ঘরবাড়ি হুমকির মুখে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) সকালে দেখা গেছে, রংপুরের গঙ্গাচড়ার মহিপুরে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় সড়ক সেতুর পশ্চিম তীরে সেতু রক্ষা বাঁধের প্রায় ৭০ ফুট গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতে ৯০০ মিটার দীর্ঘ বাঁধের একাধিক স্থানে ব্লক ধসে পড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত মেরামত না হলে পুরো বাঁধ ভেঙে সেতু ও রংপুর–লালমনিরহাট সড়ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে প্রায় ১২১ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সেতুটি নির্মাণ করে। এটি দুই জেলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপনা হলেও চলমান ভাঙন নিয়ন্ত্রণে না এলে সেতু ও সংলগ্ন সড়ক ঝুঁকিতে পড়বে।
এদিকে, পীরগাছা উপজেলার তিস্তা নদী বেষ্টিত ছাওলা ইউনিয়নের শিবদেবসহ আশপাশের এলাকায় শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শুধু শিবদেব গ্রামেই সাম্প্রতিক ভাঙনে কমপক্ষে ৫০টি বসতবাড়ি, একটি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হারিয়ে গেছে। তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে সরে গেছে, কেউ কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ পরিবারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এক বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ৩ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা জরুরি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, বুধবার (১৩ আগস্ট) রাত থেকে বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে তিস্তার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নীলফামারীর ডালিয়া ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ডিমলা উপজেলার খগাগড়িবাড়ী, খালিশা চাপানি, পূর্ব ছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ী, ঝুনাগাছ চাপানি, গড়াবাড়ী, জলঢাকার গোলমুন্ডা, শেলৈমারী, কৈইমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চর গ্রাম ঝাড়সিংশ্বরসহ কয়েকটি এলাকায় ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা ও কালিগঞ্জ উপজেলার নদীবেষ্টিত চরে হাঁটুসমান পানি প্রবেশ করেছে, ফলে মানুষজন গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়ে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই সঙ্গে উজানে ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। বুধবারও দিনভর রংপুর বিভাগে এবং তিস্তার উজানে দিনভর বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী দুই দিন রংপুর অঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ঝুঁকি থাকবে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও পদ্মা অববাহিকার নদনদী সতর্ক সীমায় প্রবাহিত হতে পারে, পদ্মা নদীর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
গঙ্গাচড়ার ইউএনও মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ডালিয়া ডিভিশনের উপসহকারী প্রকৌশলী তহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছর একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়া থেকে রক্ষা পেতে স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।