খুলনা অফিস
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৫ ১৮:৫১ পিএম
খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সর্বশেষ অডিট রিপোর্টে পাঁচ বছরে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে- যা খুলনার আইনজীবী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের দিন এবং পরদিন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের ঘটনা সন্দেহের তীর আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বুধবার (১৩ আগস্ট) বিকালে সমিতির মিলনায়তনে বিশেষ সাধারণ সভায় ৭৮ পৃষ্ঠার এই অডিট রিপোর্ট উপস্থাপন করেন সদস্য সচিব অ্যাড. নূরুল হাসান রুবা। আহ্বায়ক অ্যাড. আব্দুল্লাহ হোসেন বাচ্চুর এক প্রশ্নে উপস্থিত সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে তৎকালীন সভাপতি অ্যাড. মো. সাইফুল ইসলাম ও তার নেতৃত্বে থাকা নির্বাহী পরিষদের বিরুদ্ধে মানিস্যুট মামলা করার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সিনিয়র আইনজীবী অ্যাড. আব্দুল মালেকের প্রস্তাবে ১১ সদস্যের প্যানেল গঠন করা হয়।
অডিটে পাওয়া অনিয়মগুলো আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবের এক সম্পূর্ণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
প্রধান অভিযোগগুলো হলোÑ ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা ও কোটি কোটি টাকার লেনদেনÑ যার কোনো বৈধ অনুমোদন নেই।
নির্বাহী পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই একাধিক এফডিআর ভেঙে নগদ উত্তোলন, কিছু ক্ষেত্রে নতুন এফডিআর খোলা হলেও নথি নেই। ব্যক্তিগত ঋণ হিসেবে সদস্য ও কর্মকর্তাদের লাখ লাখ টাকা প্রদান, ফেরতের প্রমাণ নেই। সাংস্কৃতিক, সাংগঠনিক ও নির্মাণ কার্যক্রমে ভুয়া বিল তৈরি, বাজারদরের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ প্রদান। গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে নগদ উত্তোলন ও খরচ, কিছু ক্ষেত্রে কোনো নথি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ব্যালেন্স শিট ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের অমিল। অডিট টিমকে আর্থিক রেজিস্টার, বিল ভাউচার ও চেক কাউন্টারফয়েল সরবরাহ না করা।
অডিটে সবচেয়ে বিতর্কিত তথ্য হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের দিন এবং পরদিনও বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলন। অধিকাংশ ব্যাংক হিসাবে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে, সংশ্লিষ্টরা আগেভাগে পরিস্থিতি অনুধাবন করে তহবিল সরানোর চেষ্টা করেছেন।
প্রধান অভিযুক্ত অ্যাড. মো. সাইফুল ইসলাম শুধু সমিতির তৎকালীন সভাপতি নন, তিনি খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতিও ছিলেন। ফলে, এই আর্থিক কেলেঙ্কারি কেবল একটি পেশাজীবী সংগঠনের দুর্নীতি নয়, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনাও ইঙ্গিত করছে।
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনগত তদন্ত শুরুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাৎসরিক অডিট অনলাইন অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম চালু, আর্থিক লেনদেন সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে অ্যাড. সাইফুল ইসলামসহ অভিযুক্তরা পলাতক আছে।
সভায় গৃহীত মামলার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে, এই কেলেঙ্কারি খুলনার আইনজীবী মহলের সবচেয়ে বড় আইনি লড়াই হয়ে উঠতে পারে।