× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রূপগঞ্জে যত সন্ত্রাস-অপকর্মের নাটের গুরু কে এই মোঘল?

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ০০:৪৬ এএম

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ০০:৫০ এএম

আওয়ামী সরকারের আমলে ১৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে বক্তব্যরত মোঘল (লাল বৃত্ত চিহ্নিত)। ফাইল ফটো

আওয়ামী সরকারের আমলে ১৫ আগস্টের অনুষ্ঠানে বক্তব্যরত মোঘল (লাল বৃত্ত চিহ্নিত)। ফাইল ফটো

জুলাই অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পালিয়ে যান দলটির অধিকাংশ নেতা। আর যারা দেশের ভেতরে আত্মগোপনে রয়েছেন তারাও এড়িয়ে চলছেন সাধারণ কর্মীদের। এ রকম সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে দেশে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আওয়ামী লীগ নেতা তারিকুল ইসলাম মোঘল। অভিযোগ উঠেছে দেশে ফিরেই তিনি বিএনপির একাংশের সঙ্গে আঁতাত করে সংগঠিত করছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহলের নির্দেশনায় দেশকে অস্থিতিশীল করতে ও নাশকতার ছক বাস্তবায়নে জোর তৎপরতায় লিপ্ত থাকার। একই সঙ্গে তার প্রত্যাবর্তনের পর থেকে রূপগঞ্জ এলাকায় নানা অপরাধ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নির্বিচারে চাঁদাবাজির ঘটনাও বেড়ে গেছে। সঙ্গত কারণেই সবার মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, চব্বিশের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পরও দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারী কে এই মোঘল?

স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময়ের ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী ও জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত মোঘলের রয়েছে নানা দেশে গোল্ডেন ভিসা। এর মধ্যে দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা অন্যতম। এসব দেশে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে তার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুবাইতে ১০ বছরের গোল্ডেন ভিসা ও থাইল্যান্ডের ২০ বছরের এলিট ভিসা রয়েছে মোঘলের। ফলে অবস্থা বেগতিক দেখলেই তিনি চোখের নিমেষে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ পাচারের পাশাপাশি ওইসব দেশে তিনি নিয়মিত ক্যাসিনোতে খেলতে যান। একটি সূত্র জানিয়েছে, উল্লিখিত দেশগুলোতে গত দেড় বছরে তিনি ক্যাসিনো খেলে হারিয়েছেন প্রায় ৩০০ কোটি টাকাÑ যার পুরোটাই তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোর-জুলুম করে আদায় করেছেন। অন্যের বাড়ি ও জমি দখল করে বিক্রির পর সেই টাকা নিয়ে তিনি বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে যান। এ ছাড়া চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিও মোঘলের অর্থ উপার্জনের অন্যতম উৎস। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ বিদেশে নেওয়ার পর দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মাফিয়ারা পাঁচ তারকা হোটেলে তার থাকা-খাওয়া ও মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করে। এসব দেশে রূপগঞ্জের এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর রাতের সঙ্গী মদ, ‍জুয়া ও নারীর জোগান দেয় ওই মাফিয়ারা। দুবাইতে পলাতক একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেও রয়েছে তার নিয়মিত যোগাযোগ। তাদের সঙ্গে হয় গোপন বৈঠকও। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দুদক ও সিআইডি মোঘলের এসব অপকর্মের তদন্ত করলে শতভাগ সত্যতা খুঁজে পাবে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তারা এখনও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওইসব দেশের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বড় বড় ক্যাসিনোতেও রয়েছে মোঘলের বিশেষ সমাদর। তার নামে বিমানের বিজনেস ক্লাসের টিকিট এবং পাঁচ তারকা হোটেলে বিশেষ সুইট বরাদ্দ থাকে সব সময়। বিদেশের ক্যাসিনোতে মোঘলের অন্যতম সঙ্গী মিরপুর এলাকার কুখ্যাত জুয়াড়ি মনির ওরফে আমেরিকান মনির ও সোহেল খান। সূত্র বলছে, মাঝেমধ্যে বিদেশে যেতে না পারলে দেশে বসেই শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার ক্যাসিনো কোর্টে বিশেষ ব্যবস্থায় ভার্চুয়ালি জুয়া খেলেন মোঘল। অনেক সময় তার দুই সহযোগী সোহেল খান ও আমেরিকান মনির বিদেশের ক্যাসিনো টেবিল থেকে ভিডিও কল দেন। প্রতিবার বিদেশে যাওয়ার আগে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা হুন্ডিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কামরুল নামের বিশ্বস্ত এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে টাকা বিদেশে টাকা পাচার করেন মোঘল। তার ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার ইতিহাস স্থানীয় প্রশাসনেরও অজানা নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গত দেড় বছরে মোঘল অন্তত ১৭ বার দেশের বাইরে গিয়েছেন। তার নামে রয়েছে দুটি পাসপোর্ট। সর্বশেষ গত বছরের মে মাসের মাঝামাঝিতে তিনি দুবাই যান। ধারণা করা হচ্ছে, এরপর তিনি আরও কয়েকটি দেশ ঘুরে বাংলাদেশে ফেরেন জুলাইয়ের শুরুতে। তার গতিবিধি পর্যাবেক্ষণ করা হচ্ছে।’

জানা যায়, মোঘল ও আমেরিকান মনিরের নামে শ্রীলঙ্কার বেলিস ক্যাসিনো থেকে ইস্যু করা ইউএল এয়ারলাইনসের টিকিটের কপি সম্প্রতি গণমাধ্যমের হাতে আসে। এতে দেখা যায়, বেলিস ক্যাসিনোর এজেন্ট নালিন মাঞ্জুলা ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ মোঘল ও মনিরের নামে মোট ৪টি বিজনেস ক্লাসের টিকিট পাঠান। টিকিটে তাদের দুজনের ক্যাসিনো মেম্বারশিপ নম্বর বিএম ৫৭৩৬৬ (তারিকুল ইসলাম মোঘল) এবং বিএম ৫২৬৫৫ (মনির উদ্দিন) উল্লেখ করা হয়।

ইমিগ্রেশন পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোঘল নিয়মিত শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, দুবাই ও থাইল্যান্ডে যাতায়াত করেছেন। এই ৩ বছরে তিনি শুধু মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও দুবাই গিয়েছেন অর্ধশতাধিক বারেরও বেশি। এর মধ্যে ২০১৭ সালে কুয়ালালামপুর যান পাঁচবার, কলম্বো ছয়বার ও একবার ব্যাংকক। ২০১৮ সালে কলম্বো গিয়েছেন ছয়বার, কুয়ালালামপুর চারবার ও জেদ্দা গিয়েছেন একবার। ২০১৯ সালেও তিনি দফায় দফায় শ্রীলঙ্কা যান। ঢাকা-কলম্বো যাতায়াত করেন ১২ দফা, দুবার গিয়েছেন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে, একবার ব্যাংক ও একবার দুবাই ভ্রমণ করেছেন।

মোঘলের বিদেশ যাতায়াত সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘মোঘলের বিদেশে যাতায়াত অনেকটা ডালভাতের মতো। কারণ ২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি তিনি কলম্বো গিয়ে ফিরেছেন ছয়দিন পরই। আবার ১৯ জানুয়ারি গিয়ে ফিরেছেন ১০ দিন পর (২৮ জানুয়ারি)। মার্চ ও এপ্রিলেও তিনি পরপর কয়েক দফা কলম্বো গিয়েছেন। ৬ মার্চ কলম্বো গিয়ে ফেরেন ১১ মার্চ। আবার ১৫ মার্চ গিয়ে ফেরেন ১৯ মার্চ। ১১ এপ্রিল গিয়ে ফিরে আসেন ১৭ এপ্রিল। ’

সূত্র বলছে, মোঘল সবচেয়ে বেশি গিয়েছেন শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর বেলিস ক্যাসিনোতে। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে তাকে দেখা যায় মালয়েশিয়ার গ্যাংটিং হাই ল্যান্ড ক্যাসিনোয়। অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়, সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে ক্যাসিনোতে তিনি ব্ল্যাক লিস্টেড। মোঘল দুবাইয়ে বিমানবন্দরে ই-গেট দিয়ে প্রবেশ করেন বিনা বাধায়। কারণ তিনি দুবাইয়ের গোল্ডেন রেসিডেন্স কার্ডধারী। বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগকারীর ক্যাটাগরিতে দুবাইয়ের এই কার্ড নিয়েছেন মোঘল। সেখানে তার রয়েছে অন্তত শতকোটি টাকা মূল্যের বাড়ি ও গাড়ি। এ ছাড়া নামে-বেনামে ওই দেশে আরও বিনিয়োগ রয়েছে তার। স্বর্ণ চোলাচালানের সঙ্গেও তিনি যুক্ত বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। 

এমন পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদাতা কীভাবে দেশে ফিরলেন এবং ইমিগ্রেশন পার হলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঞ্চন পৌরসভার আওয়ামী লীগের মেয়র ও পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের ভাই মোঘল এখন যুবলীগ নেতা থেকে বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন। অথচ তার অতীত কর্মকাণ্ড ছিল কট্টর বিএনপিবিরোধী। তার পুরো পরিবারই আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত।

রূপগঞ্জ থানা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৪ এপ্রিল প্রতারণার অভিযোগে মোঘলের নামে নারায়ণগঞ্জ আদালতে দুটি সিআর মামলা দায়ের হয়। মামলা দুটি এখনও তদন্তাধীন। এ ছাড়া রূপগঞ্জ থানায় ২০২৩ সালেও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তার নামে একটি মামলা (মামলা নং-৩১৬) দায়ের হয়। তার বিরুদ্ধে বাছির হত্যা মামলা, বাদশা মেয়রকে হত্যাচেষ্টা ও আবুল বাশার মেয়রকে মারধরের অভিযোগেও রূপগঞ্জ থানায় মামলা রয়েছে। এ ছাড়াও একই থানায় তার নামে ২০০৯ সালে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে অপর একটি মামলা (মামলা নং-৩৯) দায়ের করেন এক ভুক্তভোগী।

কাঞ্চন পৌর এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোঘলের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগেরও অন্ত নেই। পৌর এলাকা ও কেন্দুয়ার মানুষ যেন এই মোঘল ‘সাম্রাজ্য’-এর নগণ্য প্রজা! এই অপরাধী নানা যোগসাজশের মাধ্যমে স্থায়ী জামিন লাভেরও অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। 

(পর্ব ২)।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা