কিশোরগঞ্জ
সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৫ ১১:৪৬ এএম
সড়কে শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতার অন্যতম উদাহরণ হয়ে উঠছে কিশোরগঞ্জ জেলা শহর। শহরের প্রতিটি রাস্তায় প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। শনিবার তোলা। প্রবা ফটো
সড়কে শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতার অন্যতম উদাহরণ হয়ে উঠছে কিশোরগঞ্জ জেলা শহর। সাম্প্রতিক সময়ে এ শহরের প্রতিটি রাস্তায় প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। বাসা থেকে বের হলেই সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় যানজটেÑ এমন অভিজ্ঞতা থেকে বাদ নেই শহরের কোনো বাসিন্দা। শহর হওয়ায় ব্যস্ততা থাকবে, তাই বলে সড়কে সড়কে অরাজকতা বিষয়টি কেউ মেনে নিতে পারছেন না। যানজটের পুরনো চিত্র যেন দিনকে দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। এতে সময় নষ্টের পাশাপাশি বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবে সড়কের মোড়ে মোড়ে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও কেন এই যানজট নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে নাÑ এমন প্রশ্ন সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও পুলিশ বিভাগ কার্যকরভাবে একসঙ্গে কাজ না করায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পৌরসভার অনুমোদিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সংখ্যা প্রায় ৬০০ হলেও বাস্তবে শহরের রাস্তায় চলছে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার। এর অধিকাংশই আসে শহরের বাইরের উপজেলা এলাকা থেকে। সরু রাস্তা, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, যেখানে-সেখানে অটোস্ট্যান্ড, ফুটপাত দখল, পার্কিংয়ের অভাবসহ নানা অনিয়মে প্রতিদিন যানজট চরমে পৌঁছায়।
গতকাল শনিবার শহরের গৌরাঙ্গ বাজার, পুরান থানা, একরামপুর, আখড়া বাজার ও আঠারোবাড়ি কাচারি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই থেমে আছে যান চলাচল। কোথাও কোথাও গাড়ি চললেও গতি নেই। রিকশা, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কারণে শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অবর্ণনীয় অবস্থা। এতে সময় ও অর্থ যেমন নষ্ট হচ্ছে, মানুষের দুর্ভোগও ছাড়িয়ে যাচ্ছে সহনীয়তার সব সীমা। প্রতিদিনের যানজটের কবলে পড়ে নানা স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন শহরের বাসিন্দারা। যানজটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি নারী-শিশুদের।
যানজটের কারণে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী যেমন শারীরিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন, তেমনি স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদেরও পড়তে হচ্ছে সময়ের অপচয়ে। অনেকে পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সদর উপজেলা যশোদল থেকে জেলা শহরে প্রাইভেট পড়তে আসা পৌর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী রুনা আক্তার বলেন, প্রতিদিনই কমবেশি যানজটে পড়ে সময় অপচয় হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এ শহরের যানজট তার প্রতিদিনের সঙ্গী।
শোলাকিয়া থেকে শ্বাসকষ্টের রোগী নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে আসা রবিউল হুসাইন বলেন, শোলাকিয়া থেকে অটোরিকশায় হাসপাতালে যেতে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট। সেখানে যানজটের কারণে সময় লেগেছে প্রায় ৫৪ মিনিট। এমনিতেই শ্বাসকষ্টের রোগী, তারপর যানজট। এর থেকে পরিত্রাণ চাই।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আল আমিন হোসেন বলেন, সড়কে দিনকে দিন যানজট বেড়েই চলছে। পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ সড়কে যেন থেকেও নেই। তারা আগের মতো ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে না। আগে যেভাবে তারা সড়কে দায়িত্ব পালন করতেন এখন অনেকটা তারা নীরব দর্শকের মতো দায়িত্ব পালন করছেন।
জেলা শহরের নীলগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ এখন ঘুষও নেয় না, কাজও করে না। তারা যদি ঠিক মতো কাজ করে, তবে এই যানজট দূর করা কঠিন কিছু না। পুলিশের ঠিক মতো কাজ না করাই এই যানজটের মূল কারণ।
এদিকে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও নানা কারণে নিরুৎসাহিত। তাদের ভাষ্যমতে, আইন প্রয়োগ করতে গেলেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় জনসাধারণ। কেউ কথা শোনে না, কেউ মানে না নিয়ম। গাড়িচালক ও যাত্রীদের দুর্ব্যবহারে তারা অতিষ্ঠ। অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে গেলে তেড়ে আসেন চালক ও যাত্রীরা।
পুরান থানা এলাকায় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা আসছিল আমি রিকশা আটকে বলি, পৌর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন, এখন আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি শুনে যাত্রী ও চালক দুজনেই আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয় ওঠেন। উল্টো আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন।’
জেলা ট্রাফিক পুলিশের টিআই (প্রশাসন) সৈয়দ মনিরুজ্জামান জানান, কিশোরগঞ্জ সরু রাস্তার শহর। রাস্তায় হকার, মোটরসাইকেল পার্কিং, আর অতিরিক্ত অটোরিকশাÑ সব মিলিয়ে সমস্যা বেড়েই চলেছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
কিশোরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক সৈয়দ শফিকুর রহমান বলেন, সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। সবার সঙ্গে পরামর্শ করে একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অবলম্বন করে দ্রুতই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।