অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৫ ০৮:৫৯ এএম
একসময় দখল ও দূষণের কবলে পড়ে প্রাণ হারাতে বসা ঐতিহাসিক করতোয়া নদী আবারও ফিরছে তার হারানো রূপে। শতাব্দী প্রাচীন পুণ্ড্রসভ্যতার সাক্ষ্যবাহী এই নদীকে ঘিরেই একসময় গড়ে উঠেছিল বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র বগুড়া। তবে সময়ের ব্যবধানে করতোয়া রূপ নেয় ময়লার ভাগাড়ে, হারায় নাব্যতা ও সৌন্দর্য। সেই নদীকেই পুনরুজ্জীবিত করতে বছরব্যাপী আন্দোলনের পর উদ্যোগ নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। শহরাংশে খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের ফলে আজ করতোয়ার তীরে গড়ে উঠেছে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন এক পর্যটন স্পট। এর মাধ্যমে যেমন ফিরে এসেছে নদীর প্রাণ, তেমনি বদলে যাচ্ছে শহরের পরিবেশ ও মানুষের নদীকেন্দ্রিক জীবনধারা।
বগুড়া শহরের বুক চিড়ে বয়ে চলা করতোয়া নদীকে ঘিরেই দুই হাজার পাঁচশ বছর আগে গড়ে ওঠা পুণ্ড্রসভ্যতা ছিল বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে পালতোলা নৌকায় পণ্য আনা-নেওয়া হতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। অথচ একসময়কার সেই প্রমত্তা নদী ছিল কঙ্কালসার, দখল-দূষণে হারিয়ে ফেলেছিল নাব্যতা। করতোয়ার প্রাণ ফেরাতে স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৩৬ কোটি টাকার ‘করতোয়া পুনঃখনন ও ডান তীরে স্লোপ প্রটেকশন’ প্রকল্প অনুমোদন পায়, যা ২০২৪ সালের মার্চে শুরু হয়ে সম্প্রতি শেষ হয়েছে। এতে শহরের প্রায় ২৮ কিলোমিটার নদী খনন এবং এসপি ব্রিজ থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত ৭৩০ মিটার এলাকায় নদীতীর সুরক্ষা কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ডিসি অফিসের সামনে নির্মিত হয়েছে ১২ ফুট প্রশস্ত ওয়াকওয়ে, বসানো হয়েছে রঙিন টাইলস, সৌরবিদ্যুৎ চালিত আলোকসজ্জা, তিন ফুট প্রশস্ত ড্রেন, ১৪টি রঙিন ছাতা ও বেঞ্চ। তীর রক্ষা ও স্লোপিংয়ের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে একটি পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন ও মুগ্ধকর নদীতীর। ফলে করতোয়ার পাড় এখন পরিণত হয়েছে পরিবার-বান্ধব ও পর্যটন উপযোগী এক মনোরম স্থানে।
নদীপাড়ে ঘুরতে আসা মাহাবুব হাসান সোহাগ বলেন, ডিসি অফিসের সামনে করতোয়া নদীর পাড় দেখে বোঝা যায় না এটি একসময় ময়লার ভাগাড় ছিল। এখন পরিবার নিয়ে নির্ভয়ে ঘোরা যায়Ñ নদীটি সত্যিই বদলে গেছে।
কলেজ শিক্ষার্থী মাহমুদা খাতুন বলেন, এখনকার করতোয়া নদী খুব দৃষ্টিনন্দন। যদি পুরো শহরে এমন উন্নয়ন হয়, তাহলে এটি পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে।
সৌন্দর্যবর্ধন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার মাইনুল হাসান সুমন, হুমায়ুন কবীর ও আব্দুর রকিব জানান, প্রথমে নদীপাড় দেখে হতাশ হয়েছিলাম, তবে এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। আমরা বগুড়ার মানুষ, বগুড়ার স্বার্থে কাজ করেছি। আবর্জনা সরিয়ে নদীকে ফিরিয়ে এনেছি তার রূপে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের জেলা সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের পর আমাদের দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে। তবে পুরো শহরে হাঁটার পথ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হলে করতোয়া সত্যিকার অর্থেই রক্ষা পাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হক জানান, খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পে করতোয়া নদী নতুন প্রাণ পেয়েছে। এখন সারাদিন পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। মাটিডালী থেকে বনানী পর্যন্ত আরও একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। এটি অনুমোদন পেলে করতোয়ার দু’পাড়েই সৌন্দর্যবর্ধন হবে এবং নদী দখল-দূষণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হবে।