দিলীপ মজুমদার, কুমিল্লা
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৫ ০৯:৫০ এএম
লাকসাম দৌলতগঞ্জ রেলস্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ের সম্পত্তিতে সারিবদ্ধভাবে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান ঘর
কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্থাপনাগুলো বছরের পর বছর ধরে অবৈধ দখলের কবলে পড়েছে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দখলদাররা সরকারি জমিতে গড়ে তুলেছে স্থায়ী মার্কেট ও স্থাপনা। জেলার লাকসাম উপজেলার দৌলতগঞ্জসহ একাধিক রেলওয়ে স্টেশনটি অবৈধ দখলের কবলে পড়ে কার্যত অচল হয়ে আছে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় এই দখলদারির ঘটনায় দৌলতগঞ্জ রেলস্টেশনের লুপলাইন ও জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে ৫২৪টি দোকানের হকার্স মার্কেট।
রেলের ফিল্ড কানুনগো অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী শুধু দৌলতগঞ্জই নয়, গুণবতী, নাঙ্গলকোট, খিলা, নাথেরপেটুয়া এবং লাকসাম স্টেশন এলাকাসহ মোট ৬.১৩ একর রেলভূমি বর্তমানে ৪৭৭ জন দখলদারের দখলে রয়েছে। কেউ টিনশেড দোকান, কেউ আবার পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন এসব জমিতে।
দৌলতগঞ্জ স্টেশনের লুপলাইন ও জলাশয় ভরাট করে ২০১৫ সালে শুরু হয় বিশাল হকার্স মার্কেট নির্মাণের কাজ। তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের নির্দেশে ডাকাতিয়া নদী থেকে ড্রেজার মেশিনে বালু এনে রেলের জলাশয় ও লুপলাইন ভরাট করা হয়। পরের বছর ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বাজারটির উদ্বোধন করেন। এরপর পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় টোকেনের মাধ্যমে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ার তদারক করেন তৎকালীন পৌর মেয়র ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক আবুল খায়ের।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিটি দোকানের ভিটি ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকায় হাতবদল হয়, অথচ তারা বুঝতে পারেননি জায়গাটি রেলের। এখন প্রতিদিন দোকানপ্রতি ৫০ টাকা করে খাজনা আদায় করা হচ্ছে।
রেলের পূর্বাঞ্চলীয় বিভাগীয় ব্যবস্থাপক এবিএম কামরুজ্জামান বলেন, দৌলতগঞ্জের দখল পূর্বাঞ্চলীয় রেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা। লুপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বারবার উচ্ছেদে গেলে রাজনৈতিক চাপ আসে। তবে আমরা পিছু হটছি না। নোটিস পাঠানো হচ্ছে, প্রয়োজনে অভিযান চালানো হবে।
এদিকে চলতি বছরের জুনে লাকসাম ও হাসানপুর স্টেশনে সফলভাবে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হলেও ২২ জুন গুণবতী স্টেশনে বাধার মুখে অভিযান স্থগিত হয়। যদিও রেল বিভাগ বলছে, রাজনৈতিক চাপ থাকলেও এবার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এই উদ্যোগ কতটা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. কাউছার হামিদ বলেন, ‘এই মার্কেট দীর্ঘদিন ধরেই পৌরসভা ইজারা দিয়ে পরিচালনা করে আসছে। তবে জমিটি যে রেলের, তা সত্য। রেল বিভাগ তাদের জমি উদ্ধারে উদ্যোগ নিলে স্থানীয় প্রশাসন সর্বাত্মক সহায়তা করবে। ইতোমধ্যে রেলওয়ে এলাকাসহ সব অবৈধ দখলদারের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের আলোচনা হয়েছে। যেসব স্থাপনায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা নেই সেগুলো দ্রুত উচ্ছেদে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বর্তমান ইজারাদার ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল মজুমদার বলেন, ‘আমি পৌরসভার লটারিতে প্রায় ৩৩ লাখ টাকায় মার্কেট ইজারা নিয়েছি। প্রতিটি ভিটিতে দৈনিক ৫০ টাকা করে খাজনা আদায় করছি। আওয়ামী লীগের লোকেরা আগে এই জায়গা দখল করে কোটি টাকার ব্যবসা করেছে।’
ফিল্ড কানুনগো ইকবাল মাহমুদ জানান, ৬.১৩ একর জমির দখলদারদের তালিকা তৈরি হয়েছে। গুণবতী, নাঙ্গলকোটসহ অন্যান্য স্টেশন এলাকাতে আদালতের নিষেধাজ্ঞাহীন সব স্থাপনা দ্রুত উচ্ছেদে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।