সাইদুল ইসলাম মন্টু, বেতাগী (বরগুনা)
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৫ ২০:৪৫ পিএম
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৫ ২০:৪৮ পিএম
বরগুনার বেতাগী উপজেলায় বিষখালী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপদে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ভয়াবহ দূষণে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য। স্থানীয় খাল-বিল, পুকুর, নদী-নালা ভরে গেছে ক্যান্ডি, চিপস ও জুসের প্যাকেট, পানির বোতল, শ্যাম্পু ও সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকসহ নানা অপচনশীল বর্জ্যে।
সরকার ২০০২ সালেই দেশে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও বেতাগীতে এ নিয়ম কার্যত উপেক্ষিত। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এখনও চলছে অননুমোদিতভাবে পলিথিনের বিক্রি ও ব্যবহার। নেই কোনো ডাম্পিং ব্যবস্থা, না আছে সুনির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহের পাত্র কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এতে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা; যা নদীভাঙনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও এ উপজেলায় বাস্তবে নেই তার প্রয়োগ।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় অননুমোদিত পলিথিন, প্লাস্টিক বিপণন হচ্ছে। শহরের বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, সামাজিক অনুষ্ঠান, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকা পর্যন্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণে নাকাল। দেড় লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ওয়ার্ড কিংবা গ্রাম সর্বত্র জলাবদ্ধতা মারাত্মক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখানকার ৮৫ শতাংশ ড্রেন পলিথিনে আবদ্ধ।
বেতাগী সদর ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুস সোবাহান বলেন, পরিবেশ দিবস গেলেও এসব নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেনি। আগে একমাত্র পলিথিন ছিল, এখন পানির বোতলসহ নানা ধরনের প্লাস্টিকের পট ও প্যাকেটে সয়লাব।
বেতাগী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, স্কুলে আসার পথে চারপাশে ময়লা-আবর্জনার এমন ছড়াছড়ি দেখে মনটাই খারাপ হয়ে যায়। কেউ কিছু করছে না, এটাও দুঃখজনক।
বেতাগী উন্নয়ন আন্দোলনের সভাপতি প্রভাষক আবুল বাসার খান বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও জনসচেতনতা ছাড়া এ সংকট সমাধান সম্ভব নয়।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, পলিথিন মাটির উর্বরতা নষ্ট করে কৃষিকাজে মারাত্মক ক্ষতি করছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানজিলা আহমদ বলেন, একটি পলিথিন নষ্ট হতে সময় লাগে প্রায় ৪০০ বছর। এটি শুধু মাটি নয়, আমাদের ফসল ও খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকিতে ফেলছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়্যিদ মুহাম্মদ আমরুল্লাহ বলেন, ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখলে রাসায়নিক পদার্থ খাবারে মিশে যায়। এটি হজম সমস্যা, অ্যালার্জি এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে।
পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন যেমন কোডেক, গ্রিন পিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি এবং ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বেতাগীতে প্লাস্টিকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালালেও তা এখনও প্রয়োজনীয় মাত্রায় পৌঁছেনি।
কোডেকের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিন বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরকে স্থানীয় প্রশাসনের সহযেগিতায় ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণসহ কার্যকর ও সফল বাস্তবায়নে পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমতে পারে।
গ্রিন পিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি ও ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক খাইরুল ইসলাম মুন্না বলেন, সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে বিকল্প হিসেবে পাট, কাগজ বা মাটির তৈরি পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাই এখন জরুরি।
সুন্দরবন প্রকল্পের সমন্বয়কারী অনুপ রায় বলেন, পাটের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে পলিথিনের বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগে কঠোরতা আনতে হবে।
বরগুনা জেলা সুন্দরবন সাংবাদিক ফোরামের আহ্বায়ক মনির হোসেন কামাল বলেন, আইন রয়েছে কাগজে-কলমে, স্থানীয় পর্যায়ে সব অংশীজনকে নিয়ে পলিথিন ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ স্থানীয় প্রশাসনকেই নিতে হবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তুরান জানান, বিষখালী নদীর তলদেশে পলিথিন জমে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, কমছে মাছও। ইতোমধ্যে অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পলিথিনই হবে নদীর প্রধান উপাদান।
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. বশির গাজী জানান, পরিবেশ দিবসে আমরা আলোচনা সভার আয়োজন করেছি। তবে শুধু প্রশাসন নয়, সকলকে সচেতন হয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।