চারঘাট স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র
শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৫ ১৭:৪৫ পিএম
আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৫ ১৭:৫১ পিএম
রাজশাহীর চারঘাটের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে চলছে ওষুধ সংকট। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীরও সংকট রয়েছে। ফলে চিকিৎসা নিতে মানুষ খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিত গর্ভধারণের ঝুঁকি।
উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চারঘাটে রয়েছে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পাঁচটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ২৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব কেন্দ্র থেকে নিয়মিত সেবা নেয় উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার ৩০৫ জন দম্পতি। কিন্তু ছয় মাস ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে ২৩ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ প্রায় বন্ধ। একই সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহেও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
শলুয়া, নিমপাড়া ও ভায়ালক্ষ্মীপুরসহ একাধিক ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, জনবল সংকটের পাশাপাশি ওষুধ না থাকায় রোগীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। আগে প্রতিদিন যেখানে গড়ে ৫০-৬০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসতেন, এখন তা দাঁড়িয়েছে ১০-১২ জনে।
শলুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা নাসিম আহমেদ বলেন, আমরা এখন শুধু পরামর্শ দিচ্ছি। ওষুধ না পেয়ে রোগীরা ফিরে যাচ্ছেন। আগে প্রতিদিন অনেক রোগী আসতেন। কিন্তু এখন আসছেন হাতে গোনা কজন। ডিসেম্বরের পর থেকে আর কোনো ওষুধ পাইনি। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীও প্রয়োজনের তুলনায় কম পাচ্ছি।
নিমপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট মোস্তাকিন হোসেন জানান, ওষুধের পাশাপাশি কনডম, খাওয়ার বড়িসহ জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীরও সংকট চলছে। আগে প্রতি মাসে যে পরিমাণ সরবরাহ পেতাম, এখন তার এক-তৃতীয়াংশও পাচ্ছি না। রোগীরা ফিরে যাচ্ছেন হতাশ হয়ে।
ভ্যানচালক রবিউল ইসলাম বলেন, বাজারে এখন জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দাম অনেক বেশি। তাই আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই সংগ্রহ করতাম। কিন্তু এখন মাসের পর মাস কনডম পাচ্ছি না। কখনও পেলেও তা কম।
ভায়ালক্ষ্মীপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মেহেরুন নেসা বলেন, কেন্দ্র ঠিকমতো খোলা থাকে না। খোলার সময়ও জ্বর-সর্দির মতো সাধারণ ওষুধও পাওয়া যায় না। কয়েক মাস ধরে কোনো ওষুধ দিচ্ছে না। শুধু প্রেসার মেপে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আগে অন্তত কয়েকটা ওষুধ পেলেও সংসারে একটু সাশ্রয় হতো।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্র জানায়, ৫০ হাজার ৩০৫ জন দম্পতির জন্য প্রতি মাসে খাওয়ার বড়ির চাহিদা ১৫ হাজার সেট, কিন্তু গত মাসে সরবরাহ হয়েছে মাত্র ১৫৪ সেট। ২৫ হাজার কনডমের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ এসেছে ১৩ হাজার ৯০৫ পিস। আইইউডি, ইমপ্ল্যান্ট, ডিডিএস কিট একদমই আসেনি। ২৩ প্রকারের জরুরি ওষুধের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে ছয় মাস ধরে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চারঘাট উপজেলার সহসভাপতি আঞ্জুমান আরা বলেন, এভাবে দীর্ঘদিন ওষুধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না থাকায় সাধারণ মানুষ স্থানীয় ফার্মেসিতে গিয়ে বেশি দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এতে তাদের খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি ভুল চিকিৎসার ঝুঁতিও বাড়ছে। পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না পেলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে।
এ ব্যাপারে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফয়সাল ফেরদৌস বলেন, ওষুধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ঘাটতির বিষয়টি আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি, কয়েক মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিনের এই সংকট দ্রুত নিরসন না হলে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী দ্রুত সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা।