সুনামগঞ্জ
সাইদুর রহমান আসাদ, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৫ ১৮:২৪ পিএম
সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধামালিয়া নদীর তীরে জব্দকৃত সরকারি বালু লুটপাটের অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য। প্রশাসনের জব্দ করা কোটি টাকার বেশি মূল্যের বালু এখন প্রকাশ্যেই লোপাট করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজু আহমেদের বিরুদ্ধে, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। প্রশাসনের নীরব ভূমিকা, পুলিশের বিতর্কিত কার্যকলাপ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে সরকারি সম্পদ লুটের এই ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে আইনের শাসন ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়েও। স্থানীয়দের প্রতিবাদ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, বালুখেকোদের এই মহোৎসব বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেই প্রশাসনের পক্ষ থেকেও।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জলিলপুরসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা শুষ্ক মৌসুমে ধামালিয়া নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিশাল স্তূপ করে রাখেন। দুই মাস আগে উপজেলা প্রশাসন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করে। বাজারমূল্যে যার পরিমাণ দেড় কোটির বেশি টাকা। কিন্তু সেই জব্দকৃত বালুর নিলাম বা নিরাপত্তার কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এখন নদীতে পানি আসার পর জব্দকৃত বালু নৌপথে বাল্কহেড ও ট্রলারে করে নিয়ে যাচ্ছে বালুখেকোরা।
গত ২২ জুন স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ চারটি বালুভর্তি নৌকা জব্দ করে স্থানীয় ইউপি সদস্যের ভাই মো. বকুল মিয়ার জিম্মায় দেয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই নৌকাগুলোও নিয়ে যায় বালু চক্র। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বকুল মিয়া।
এ ঘটনার পরের দিন জিম্মানামায় স্বাক্ষর দেওয়া বকুল মিয়া জেলা প্রশাসকের কাছে এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে জব্দনামায় স্বাক্ষর নেওয়ার পর পুলিশের সামনেই বালুবোঝাই বাল্কহেডগুলো নিয়ে যাওয়া হয় বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
বকুল মিয়া বলেন, ভরাট হওয়া ধামালিয়ার পাড়ের জলিলপুর গ্রামের প্রতিটি বাড়ির পেছনে বালু স্তূপ করে রাখা আছে। এসব বালু উপজেলা প্রশাসন জব্দও করেছে। একটি চক্র এই জব্দকৃত বালু নদীপথে নিয়ে যাচ্ছে। ২২ জুন রাতে জব্দকৃত বালু লুটের সময় পুলিশকে জানালে তারা এসে চারটি বালুভর্তি বাল্কহেড জব্দ করে সাদা কাগজে আমার স্বাক্ষর নেন। পরে তাদের সামনেই বালু ভরাট বাল্কহেড নিয়ে গেছে, তারা কিছুই বলেননি। পরদিন বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছি।
পাশের বসন্তপুর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. সুহেল বললেন, নদীতে ড্রেজার ও সনাতনী পদ্ধতিতে বালু তোলা হয়েছে। ঢলের পানি আসার পর নদীর প্রশস্ততা বেড়েছে। তাতে কিছুদিন পর দু’পাড়ের বাসিন্দারা নদী ভাঙনের শিকার হবেন। হালাবাদি গ্রামের বাসিন্দা মো. আল-আমিন বললেন, প্রশাসনের জব্দকৃত বালু কীভাবে লুট হয়ে যায়? জব্দকৃত সরকারি সম্পদ নিলামের মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের ব্যবস্থা না করে কেন লুটের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম খন্দকার বললেন, কয়েক দিন আগে কয়েকটি বালুবোঝাই ইঞ্জিন নৌকা আটকে পুলিশকে খবর দেওয়ার পর জানতে পারলাম এই বালু লুটপাটের পেছনের কারিগর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজু আহমেদ।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজু আহমেদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, এখানে আমার কোনো ব্যবসা নেই। নদী থেকে যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেছে, তারা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এরাই বিএনপির সুবিধাভোগী কিছু মানুষকে নিয়ে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ধরা পড়লে তারা আমার নাম বলে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সব অবৈধ কাজ বন্ধে প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছি।
বিশ্বম্ভরপুর থানার এসআই মজিবুর রহমান বলেন, ‘২২ জুন রাতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় বালুভর্তি চারটি নৌকা আটক করি এবং স্থানীয় ইউপি সদস্যের ভাই বকুল মিয়ার জিম্মায় দিই। পরে শুনি নৌকাগুলো চলে গেছে। ফের সেগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।’
বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ছবাব মিয়া বললেন, এক লাখ ৮০ হাজার ঘনফুট বালুর দাম কমপেক্ষ দেড় কোটি টাকা। সরকারি এই বালু লোপাট যেন না হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা সভায় জানতে চেয়েছি।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মফিজুর রহমান বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় কিছু কাজ থমকে আছে। শুনেছি জব্দকৃত বালু কারা নিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়েছে।