সরকারি আজিজুল হক কলেজ
অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৫ ০৯:২৬ এএম
সরকারি আজিজুল হক কলেজটি উত্তরবঙ্গের গর্ব, ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষা, ফলাফল ও অবকাঠামোর দিক থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর ভর্তি হয় হাজার হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের গৌরবময় নামের আড়ালেই রয়ে গেছে এক গভীর অনিয়মের চিত্র; যা বহু বছর ধরে চলছে নীরবে, নির্বিবাদে। ‘ম্যাগাজিন ফি’ নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেওয়া হলেও গত দুই দশকে কলেজ থেকে একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশ পায়নি। প্রতিবছর গড়ে ৪ লাখ টাকা, আর দুই দশকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা এই খাত থেকে তোলা হলেও নেই কোনো ব্যয়ের স্বচ্ছতা, নেই কার্যকর জবাবদিহিতা। শিক্ষার্থীদেরে প্রশ্ন- যেখানে কোনো ম্যাগাজিনই নেই, সেখানে কিসের জন্য এই টাকা আদায়?
কলেজ সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থী সংখ্যা, ফলাফল, ইতিহাস- সবদিক থেকেই প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে এইচএসসি, অনার্স, মাস্টার্স ও ডিগ্রি- সব মিলিয়ে প্রতিবছর গড়ে ভর্তি হয় প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হয় ৩০ টাকা করে ম্যাগাজিন ফি। এতে প্রতিবছর গড়ে আদায় হয় অন্তত ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই খাত থেকে আদায়কৃত টাকার পরিমাণ কেবল ভর্তি ফির মাধ্যমেই নয়, সেশন ফির মাধ্যমেও কয়েক লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়ে যায়। গত ২০ বছরে এই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ লাখ টাকায়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তারা কখনও কোনো ম্যাগাজিন দেখেননি। কেউ কেউ জানেনই না, ম্যাগাজিন ফি নামে কোনো টাকা কাটা হয়।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, সর্বশেষ ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে। এরপর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কলেজ থেকে আর কোনো ম্যাগাজিন বের হয়নি। অথচ এই সময়ের মধ্যে সাতজন অধ্যক্ষের হাত ধরে বদলেছে প্রশাসন, গঠিত হয়েছে একাধিক কমিটি।
কলেজের হিসাব শাখা জানায়, ম্যাগাজিন ফি আদায় করা হলেও ওই টাকা ব্যয় করা হয় ‘বিকল্প খাতে’। যেমন ক্যালেন্ডার ছাপানো, পত্রিকা বিল মেটানো ইত্যাদি। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে ‘ম্যাগাজিন ফি’ নামে আলাদা খাত রয়েছে, সেখানে কেন এই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় হবে? এর জন্য নির্ধারিত কোনো বাজেট কি নেই?
এই প্রসঙ্গে কলেজের সাবেক হিসাবরক্ষকদের কেউ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। কেউ কেউ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘বিষয়টা প্রশাসনিক।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, এই খাতের টাকা তোলা হয় ঠিকই, এমনকি আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টও আছে, কিন্তু কত খরচ হয়, কত জমা আছেÑ সেটা জানা নেই।
শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা বলেন, তিন বছর আগে ভর্তি হয়েছি, এখন শেষ বর্ষে। ম্যাগাজিন তো দেখি নাই, কেউ শুনেছেও না। আরেক শিক্ষার্থী রায়হান ইসলাম বলেন, ভর্তি হইছি, ৩০ টাকা নিছে ম্যাগাজিনের জন্য। পরে শুনছি কলেজে নাকি কোনোদিনই ম্যাগাজিন বের হয় না!
শুধু ভর্তি নয়, প্রতি সেশনের সেশন ফির সাথেও এই ৩০ টাকা কেটে নেওয়া হয়। আবার ম্যাগাজিন ফিই নয়, প্রশংসাপত্র তুলতেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় ৫০ টাকা। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এর নির্ধারিত ফি ৩০ টাকা। অতিরিক্ত আদায়কৃত ২০ টাকা কোথায় যায়, সেটাও অস্পষ্ট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, এই অতিরিক্ত টাকার কোনো লিখিত নিয়ম নেই। কেউ কেউ ভাগ করে নেন। কিন্তু কেউ খোলাখুলি কিছু বলেন না। এভাবে টুকটাক করে অনেক টাকাই উঠছে। কিন্তু এর কোনো হিসাব জনগণের সামনে নেই।
সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর শাহজাহান আলীর সময় ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গঠিত হয় কমিটি। লেখাও সংগ্রহ হয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে।
শিক্ষক পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন, ‘সত্যি বলতে, লেখাও সংগ্রহ হয়েছিল। আমরা অনেক কাজ এগিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না। হঠাৎই থেমে যায় সবকিছু।’
গত ২০ বছরে কলেজের নেতৃত্ব হাতবদল হয়েছে সাতবার। বদলেছেন অধ্যক্ষ, পরিবর্তন এসেছে নীতিমালায়, গঠিত হয়েছে একাধিক কমিটি; কিন্তু পরিবর্তন আসেনি একটি জায়গায়। সেটা হলো, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া ম্যাগাজিন ফির হিসাব ও স্বচ্ছতা। সরকারি আজিজুল হক কলেজে সর্বশেষ ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে। তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. সুলতান আলীর সময় স্বল্প পরিসরে একটি ম্যাগাজিন বের হয়েছিল। তারপর দুই দশকে আর একটি পাতাও ছাপা হয়নি। অথচ এ সময়টায় অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর মছির উদ্দিন, প্রফেসর একেএম ছালামত উল্লাহ, প্রফেসর দীপকেন্দ্র নাথ দাস, প্রফেসর সামস উল আলম জয়, প্রফেসর শাহজাহান আলী এবং প্রফেসর খোন্দকার কামাল হাসান। বর্তমানে আছেন প্রফেসর শওকত আলম মীর। প্রত্যেকের সময়ই ভর্তি হয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। প্রত্যেক শিক্ষার্থী ম্যাগাজিন ফি হিসাবে ৩০ টাকা করে দিয়েছেন।
অনুসন্ধানকালে সাবেক বা বর্তমান অধ্যক্ষ কেউই সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রত্যেক অধ্যক্ষই দায়িত্বে এসে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। কেউ ফোন ধরেন না, কেউ বলেন ‘আমার সময় এটা ছিল না। আবার কেউ দায়িত্ব অন্য কারও ঘাড়ে ঠেলে দিয়েছেন।
ছাত্রদলের আজিজুল হক কলেজ শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুল ইসলাম বিপ্লব বলেন, ম্যাগাজিনের নামে টাকা তোলা হয়, অথচ কোনো নাম-গন্ধই নেই। আমরা এর স্বচ্ছ হিসাব চাই।
শিবিরের সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা ইতোমধ্যে এই ব্যাপারে কলেজ প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি। তারা যা বলেছে, এতে আমরা সন্তুষ্ট নই।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সদস্য সচিব নিয়তি সরকার বলেন, শুধু ম্যাগাজিন না, আরও অনেক খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও লাইব্রেবি খাত অন্যতম।
বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর শওকত আলম মীর বলেন, ‘গত ২২ জুন একাডেমিক কাউন্সিলে ম্যাগাজিন প্রকাশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এবার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।’