ভোলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৫ ১৬:২১ পিএম
আপডেট : ১২ জুন ২০২৫ ১৬:৪৮ পিএম
ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রকাশ্যে চলছে বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু শিকারের মহোৎসব। শিকারিরা ব্যবহার করছেন নিষিদ্ধ মশারি ও নেট বেহুন্দি জাল, ফলে চিংড়ির রেণুর পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু।
দিনের পর দিন চলা এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে একদিকে যেমন দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে এর দায় এড়িয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ। এই রেণুগুলো আবার পাচার হয়ে যাচ্ছে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের চিংড়ি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মৎস্যজীবী নেতারা, যারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বুধবার (১১ জুন) সরেজমিন ভোলার সদর উপজেলার মেঘনা নদীর তুলাতুলি, নাছির মাঝি, ভোলার খাল, শিবপুর, ইলিশা জংসন ও তেঁতুলিয়া নদীর ভেদুরিয়া এবং ভেলুমিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, দিন ও রাতে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে প্রকাশ্যে শিকার করা হচ্ছে অবৈধ বাগদা ও গলদার চিংড়ির রেণু। এটি শিকারে শিকারিরা ব্যবহার করছেন নিষিদ্ধ মশারি জাল, নেট বেহুন্দি জাল। তাদের জালে চিংড়ির রেণুর সঙ্গে উঠে আসছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণুও। কিন্তু শিকারিরা চিংড়ির রেণু পাত্রে রেখে অন্যান্য মাছের রেণু নদীতীরেই ফেলে দিচ্ছেন। এতে ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ধ্বংস হচ্ছে। এদিকে যেন কোনো খেয়ালই নেই শিকারিদের।
মেঘনা নদীতে বাগদা ও গলদা শিকারি মো. রাজু, মো. ইসলামইল ও মো. আলম জানান, তারা প্রতি বছরই মার্চ মাসের শেষ থেকে জুন মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত নদীতে মশারি জাল ও নেট বেহুন্দি জাল দিয়ে বাগদা ও গলদা চিড়িং রেণু ধরেন। কোনো দিন ১ হাজার পিস, কোনো দিন ২ হাজার পিস আবার কোনো দিন ৪০০-৫০০ পিস বাগদা ও গলদার রেণু পান। এগুলো ব্যাপারীদের কাছে প্রতি পিস ১ টাকা করে বিক্রি করেন। ব্যাপারীরা এগুলো কিনে নিয়ে আবার ভোলার পাইকারদের কাছে দেড় টাকা করে পিস বিক্রি করেন।
তেঁতুলিয়া নদীতে বাগদা ও গলদা শিকারি মো. মোসলেউদ্দিন ও আব্দুল হাই জানান, আমরা বাগদা ও গলদা ধরার জন্য মশারি ও নেট বেহুন্দি জাল ব্যবহার করি। বাগদা ও গলদা চিড়িং রেণুর সঙ্গে বিভিন্ন বালিয়া, বাটা, পোয়া ও পাঙ্গাসের রেণুসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছও উঠে আসে। আমরা চিড়িং রেণু পাত্রে রেখে অন্যান্য মাছের রেণু নদীতে ফেলে দেই। কিন্তু অনেকেই আছে যারা চিড়িং রেণু পাত্রে নিয়ে অন্যান্য মাছের রেণু নদীতে না ফেলে নদীতীরে ফেলে দেন। এতে এসব মাছের রেণু মারা যায়।
ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি মো. এরশাদ জানান, প্রতি বছর এপ্রিল-মে ও জুন মাস পর্যন্ত বাগদা ও গলদা রেণুর ভরা মৌসুম চলে। এ সময় প্রচুর পরিমাণ বাগদা ও গলদা রেণু ধরে পরে শিকারিদের নিষিদ্ধ জালে। ওই জালে বাগদা ও গলদা রেণুর সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ধ্বংস করায় ভবিষ্যতে নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংকট দেখা দিবে।
তিনি আরও জানান, ভোলার জেলেদের থেকে এক টাকায় ক্রয় করা বাগদা ও গলদার রেণু বিভিন্ন হাত ঘুরে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের বিভিন্ন পাইকারি আড়তে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে আবার উচ্চ মূল্যে। বাগদা ও গলদা পাচারকারিদের যদি দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা যায় তাহলে রেণু ব্যবসা বন্ধ হবে। এতে নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়বে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর প্রচুর পরিমাণে বাগদা ও গলদা চিড়িং রেণু নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু জেলে, নারী ও শিশুরা সেগুলো শিকার করেন।
তিনি আরও বলেন, ভোলার সাত উপজেলার মধ্যে তিন উপজেলায় মৎস্য কর্মকর্তার পদ খালি। জনবল সংকটে নিয়োমিত অভিযান পরিচালনা করা যায় না। তবে এরই মধ্যে অভিযান চালিয়ে কোস্ট গার্ড ও পুলিশের সহযোগিতায় বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু পাচারের সঙ্গে জড়িত এবং জেলেদের শিকারের উৎসাহিত করার সঙ্গে জড়িত ৮ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ১ কোটি ৮০ লাখ পিস বাগদা ও গলদা রেণু জব্দ করা হয়েছে।