এহসানুল হক সুমন, রংপুর
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৫ ০৯:৩৮ এএম
উজানের পাহাড়ি ঢলে রংপুরে তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। শুক্রবার গঙ্গাচড়া উপজেলার লহ্মীটারীর চরশংকরদহ এলাকা
উজানের পাহাড়ি ঢলে রংপুরে বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী ৩ দিন বাড়বে তিস্তার পানি। তাই ঈদের আগে তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় বন্যার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া, পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদী তীরবর্তী কিছু এলাকায় ইতোমধ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে। একদিকে ভাঙন ও অন্যদিক বন্যার আশঙ্কায় পূর্বপ্রস্তুতি নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস।
উজানের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় তিস্তা নদীর ডালিয়া ও কাউনিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার এক মিটার নিচ দিয়ে বয়ে গেছে। তবে রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার নদীর পানি আগামী ৩ দিন বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে তিস্তার পানি সতর্কসীমা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
এদিকে রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, নিম্নচাপের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু রংপুর বিভাগের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে রংপুরে দুদিন ধরে হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গতকাল দিন ও রাতে রংপুর বিভাগে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও দিনে ভারী বৃষ্টি হয়নি। এ ধরনের আবহাওয়া পহেলা জুন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে জানিয়েছে রংপুর আবহাওয়া কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান। অন্যদিকে গেল ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
তিস্তার পানি বৃদ্ধি ও ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে তিস্তাপাড়ের মানুষ রয়েছে আতঙ্কে। কোরবানির ঈদের মধ্যে বন্যা ও ভাঙন নিয়ে চিন্তিত নদীপাড়ের মানুষ। এপ্রিলের শেষ দিক থেকে তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গঙ্গাচড়া উপজেলার লহ্মীটারী ইউনিয়নের চর শংকরদহে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা তহর উদ্দিন, আব্দুর রশীদ, ফরিদ মিয়া, আলিমুদ্দিন, রবিউল ইসলামসহ ১০ জনের বাড়িভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। সেই সঙ্গে নদী তীরবর্তী মানুষের জীবিকার অবলম্বন ৫০ একরের ভুট্টা, বাদাম, মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেত নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। তিস্তার ভাঙন ক্রমশ স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে তোলা বালুর গ্রামরক্ষা বাঁধের কাছে চলে এসেছে। বর্ষায় উজানের ঢলে এ বাঁধ ভেঙে গেলে তিস্তা সেতু ও রংপুর-লালমনিরহাট সড়ক ভাঙনের হুমকিতে পড়বে।
লহ্মীটারী ইউনিয়নের চরশংকরদহ গ্রামের শিক্ষার্থী মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এক মাস আগেও নদী বেশ দূর ছিল। নদী ভাঙন ক্রমাগত আমাদের বাড়ির কাছে চলে আসছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আশেক আলী বলেন, ‘১৫-১৬ বছর ধরে তিস্তার ভাঙন চলছে। এমপি-মন্ত্রী, চেয়ারম্যান নদীরক্ষা বাঁধ দেবে বলে বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করেনি। ভোটের সময় এসব কথা বললেও ভোটের পর তাদের দেখা মেলে না। এ কারণে আমরা নদী রক্ষা বাঁধের কথা বলি না।’
স্থানীয় অন্য বাসিন্দা মোহসেনা বেগম বলেন, সাংবাদিকের কাছে কথা বলে কোনো লাভ হয় না। নদী তো সব গ্রাস করে নিয়ে যাচ্ছে। আবাদি জমি তিস্তা খেয়ে ফেলেছে। বসতভিটা কিছুই বাদ রাখেনি।’ লহ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রমজান আলী বলেন, ‘চরশংকরদহ একটি সমৃদ্ধ গ্রাম ছিল। এ গ্রামের প্রতিটি বাসিন্দা ফসল আবাদ করত, মাছ ধরে জীবিকা চালাত নদী ভাঙনে এ গ্রামের সাড়ে ৪শ পরিবারের মধ্যে আছে শুধু ৮০টি পরিবার।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, আসন্ন বর্ষায় তিস্তার ভাঙন ও বন্যাকবলিত মানুষের সহায়তার জন্য প্রশাসন প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এজন্য ৭শ টন জিআর, ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ৮ উপজেলার জন্য ১৩২ বান্ডিল টিন বরাদ্দ রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় টিআর, কাবিখার কাজ চলমান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, রংপুর বিভাগে অতি ভাঙনপ্রবণ তিস্তা নদীর সাড়ে ১৯ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে কাজ চলমান আছে। ভাঙন রোধে পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ মজুদ করা হয়েছে। এ ছাড়া মূল ভূমিকে সুরক্ষিত রাখাসহ অর্থনৈতিক এলাকা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তারও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।