সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৫ ০৯:৫২ এএম
ট্যানারি সংকটে জর্জরিত চট্টগ্রামের চামড়ার আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামের এই সংকটকে পুঁজি করে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের একটি সিন্ডিকেটের কাছে চট্টগ্রামের আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। কোরবানির মৌসুমে তাদের মর্জিমাফিক দরে চামড়া বিক্রি করেও পাওনা টাকার জন্য বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। গত বছরের ৫ কোটি টাকাসহ ১০ বছরে অন্তত ২৫ কোটি টাকা বকেয়া রেখেছে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা।
এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি না পাওয়ায় লাভের মুখ তো দূরের কথা; চামড়া ক্রয়ের মূলধনও তুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। আড়তদাররা বলছেন, চট্টগ্রাম জুড়ে লাখ লাখ পশু কোরবানি দেওয়া হয়। এসব পশুর চামড়া সুষ্ঠু প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতে চট্টগ্রামে ট্যানারি শিল্পের বেশ সংকট রয়েছে। তাই ঢাকানির্ভরতা কমাতে চট্টগ্রামের বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্যানারি শিল্পগুলো চালু করা গেলে দেশের চামড়া শিল্প আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি এ শিল্পে জড়িত হাজারো ব্যবসায়ী ও আড়তদার লাভবান হবেন।
চামড়ার আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকায় ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে গত বছরের এখনও ৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এছাড়া ২০১৫-২৪ পর্যন্ত এখনও প্রায় ২০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এভাবে প্রতি বছর ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে ক্রমাগত ব্যবসার পুঁজি জমে থাকায় অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ব্যবসা কেমনে টিকে থাকবে? আমাদের হাতে খুব একটা পুঁজি নেই। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে আমরা জিম্মি হয়ে গেছি। গত বছর বিক্রীত চামড়ার এখনও ৫ কোটি বকেয়া পাচ্ছেন না চট্টগ্রামের বিভিন্ন আড়তদার। এর বাইরে গত ১০ বছরের বকেয়া জমতে জমতে প্রায় ২০ কোটি টাকা হয়ে গেছে। এর বাইরে ইদানীং চামড়ার ভালো দরও পাওয়া যায় না। সব মিলে চামড়ার আড়তদাররা নানা সংকটে রয়েছেন। তবে চলতি বছরের চামড়া সংরক্ষণের জন্য অর্থের জোগান, লবণ সংগ্রহ, গুদাম সংস্কারসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা।
চামড়ার এই আড়তদার আরও বলেন, চট্টগ্রামে আগে ১১২ জন চামড়ার আড়তদার ছিল। এখন বকেয়া ও লোকসানে পুঁজি হারিয়ে ৩০-৪০ জনের মতো রয়েছে। আর চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় আগে যেখানে ৪০০-এর বেশি ব্যবসায়ী ছিল। সেখানেও ক্রমান্বয়ে কমছে। কোরবানির সময় বেশি দামে চামড়া কিনে ঢাকার ট্যানারিদের মর্জিমতো দামে বিক্রি করেও বকেয়া রেখে দেওয়ায় এই দুর্দশা আমাদের। তাই ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে যাওয়া ২২টি ট্যানারির মধ্যে যদি অন্তত চার-পাঁচটি চালু করা যায়, তাহলে চামড়ার ব্যবসা আবার চাঙ্গা হবে। সেক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত বছর চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল ৩ লাখ ৬০ হাজার ৯৫০ পিস। অথচ প্রাণিসম্পদের হিসাবে কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছিল ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৭৬৫টি। এর আগের বছর ২০২৩ সালে সংগ্রহ করা হয়েছিল ৩ লাখ ১৮ হাজার ৮০০ পিস চামড়া। সেবার ৮ লাখ ১৭ হাজার ১২৯টি পশু কোরবানি করা হয়েছিল।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলায় এবার কোরবানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে জোগান রয়েছে ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২টি পশু। তবে প্রতিবছর কোরবানির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় অর্ধেকের চেয়ে কম চামড়া সংগ্রহ হয়। অবশিষ্ট চামড়া কোথায় যায়? সরকরি সংস্থার কাছে সেই হিসাবও নেই।
জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির আহ্বায়ক মো. আবদুল জলিল বলেন, তদারকি ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এসব চামড়া মূল্যহীন হয়ে যায়। আগে তো কোরবানির সময় সাড়ে চার লাখের বেশি চামড়া সংগ্রহ হতো। এখন কমতে কমতে সাড়ে তিন লাখে এসেছে দাঁড়িয়েছে। ঢাকানির্ভরতা কমিয়ে চট্টগ্রামে বন্ধ ট্যানারিগুলোর মধ্যে দুয়েকটি চালু করা খুবই দরকার। এতে দেশের চামড়া শিল্প আরও বেগবান হবে।
জানা যায়, চট্টগ্রামে ২২টি কারখানা থেকে নানা সংকটে বন্ধ হতে হতে এখন চালু আছে মাত্র ১টি। ‘রিফ লেদার লিমিটেড’ নামে টি কে গ্রুপের এই সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯১ সালে কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিবছর কোরবানিতে প্রতিষ্ঠানটি লক্ষাধিক পিস চামড়া সংগ্রহ করে থাকে।