ফেনী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ০৮:২৬ এএম
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর। মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ফেনীর মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর নৃশংস বর্বরতায় ক্ষত-বিক্ষত ফেনী শহরে স্বাধীনতাকামী বাঙালিরা বিজয়ের নিশান উড়িয়ে উল্লাস করেছিলেন আজকের দিনেই।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী ফেনী সর্বত্র ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নিপীড়ন চালায়। স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের করতে ফেনীবাসীর অবদান বিশাল ও ঐতিহাসিক।
জেলার বিভিন্ন স্থানে আটটি বধ্যভূমিতে শহীদদের লাশ সনাক্ত বা তাদের কবর চিহ্নিত করে স্বজনহারারা।
১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার সাথে সাথে সারাদেশের মতো ফেনীও ফুঁসে উঠে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ভাষণের পর পরই ফেনীতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোরস রাজাকার, আলবদর আলশামসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য খাজা আহাম্মদ (এমএলএ) এর নেতৃত্বে ফেনীর সংগ্রাম কমিটির নেতারা সদস্য, ছাত্র, যুবক, সামরিক, আধা সামরিক সরকারি কর্মকর্তা নিয়ে মিত্রবাহিনী গড়ে তোলে। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের একিনপুর ও চোত্তাখোলায় দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লাকে ২ নম্বর সেক্টরের আওতায় কমান্ডার বীর উত্তম খালেদ মোশাররফ ও সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীর বিক্রম জাফর ইমাম দায়িত্ব পালন করেন।
ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে কর্মরত তৎকালীন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম ভারতের বিলোনীয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অভিযানে বিলোনিয়া, পরশুরাম মুন্সিরহাট, ফুলগাজী, যুদ্ধ করতে করতে এগুতে থাকে। পর্যদুস্ত হয়ে ফেনীর হানাদার বাহিনীর একটি অংশ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের রাস্তার অপর অংশ শুভপুর ব্রিজ দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়।
অপরদিকে যুদ্ধের তীব্রতা ও আক্রমণের দিক পরিবর্তন করে দাগনভূঞার কোরাইশমুন্সীতে অবস্থিত বিএলএফ এর অফিস পাঁছগাছিয়া স্থানান্তর করা হয়। বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা দাগনভূঞা, রাজাপুর, সিন্দুরপুর হয়ে শহরে দিকে এগুতে থাকে।
মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল আক্রমণে দিশেহারা হয়ে হানাদাররা ৫ ডিসেম্বর রাতে কুমিল্লার দিকে পালিয়ে যায়। সে সময় ফেনী মহাকুমার অবাঙালি প্রশাসক বেলাল এ খান পাকবাহিনীর সঙ্গে চলে যান।
ফেনী হানাদারমুক্ত হওয়ার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে করে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার বিষয়টি সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর অনেকগুলো রণাঙ্গনের মধ্যে মুন্সীর হাটের মুক্তারবাড়ী ও বন্ধুয়ার প্রতিরোধের যুদ্ধ ইতিহাস খ্যাত হয়ে আছে। এ রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরের যুদ্ধ কৌশল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানি মিলিটারি একাডেমিগুলোতে পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা এ রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের অহংকার ও গর্বের বিষয়।
এ ছাড়া সোনাগাজীর নবাবপুর সম্মুখ যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য পাকিস্তানি সেনা সুবেদার মেজর জেনারেল গোল মোহাম্মদের নেতৃত্বে সোনাগাজীর বিভিন্ন এলাকায় লুটপাট, ত্রাস, ধর্ষণ ও হত্যার উৎসবে মেতে পড়ে। এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে মুক্তিযোদ্ধারা প্রচণ্ড সম্মুখ আক্রমণ ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন ও পাকিস্তানি ২০ জন সৈনিক নিহত হয়।
জুলাই ও আগস্ট মাসের শেষের দিকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল গেরিলা আক্রমণ শুরু করেন। দাগনভূঞা, সিলোনীয়া, সিন্দুরপুর, মাতুভূঞা, দুধমুখা সেবারহাটের নুইয়ানীর পুল, বসুরহাট, সোনাগাজী, ধলিয়া বাজার, বক্তারমুন্সি, ছোট ফেনী নদীর পাড়, সাতবাড়িয়া, ভৈরব চৌধুরী, মনকাজী, বাঞ্ছারামপুর, মতিগঞ্জ, ফেনী সদর, বার্ণপাড়া, সিও অফিস, ছাগলনাইয়া, শুভপুর, চাঁদগাজী, জিনার হাট, ভূঞার হাট, কাশিপুর, পরশুরামের গুথুমা ক্যাম্পে, হাতিলুটা ফাজিলপুর, পশ্চিম লক্ষ্মীপুর, শিবপুর, কালিদহ, ছনুয়ায় ব্যাপক প্রতিরোধ ও গেরিলা হামলা জোরদার করা হয়।
৬ ডিসেম্বর ভোর থেকে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা ফেনীর পূর্বাঞ্চল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম বীর বিক্রমের নেতৃত্বে দলে দলে ফেনী শহরে প্রবেশ করতে থাকে।
জড়ো হওয়া মুক্তি সংগ্রামীরা মিছিল থেকে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেয়। শ্লোগান শুনে প্রথমে শহরবাসী বিশ্বাস করতে পারেনি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে অনেকেই পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের মিছিলে দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠেন।
এই রণাঙ্গনে ১০ নভেম্বর পাকিস্তানের ২ জন সেনা অফিসারসহ ৭২ জন পাক সেনা আত্মসমর্পণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ফেনী সরকারি কলেজ, তৎকালীন সিও অফিসসহ কয়েকটি স্থানে স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছিল। সে অমর শহীদের স্মৃতির ভাস্বর হিসেবে ফেনী কলেজ মাঠে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ও জেল রোডের পাশে বীর শহীদের নামের তালিকাসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিলোনীয়ায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।
এদিকে ফেনী মুক্ত দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন উপলক্ষ্যে ফেনী জেলা প্রশাসন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ থেকে ফেনী জেলা শিল্পকলা একাডেমি পর্যন্ত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। সকাল ১১টায় ফেনী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে আলোচনা সভা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় ফেনী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী। সভাপতিত্ব করবেন ফেনী জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান।
এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ মিনার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার এনায়েত নগর গ্রামের প্রতিষ্ঠিত তরুণ সংঘের উদ্যোগে ৪৫ কিলোমিটার তরুণ্যের পদযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরা ও ফেনী মুক্ত দিবসকে প্রতিষ্ঠিত করতে এই প্রয়াস।
এবছর পদযাত্রা শুরু হবে বিলোনিয়া সীমান্ত পরশুরাম থেকে নোয়াখালী সীমান্ত দাগনভূঞা পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার।
ফেনী জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান বলেন, ‘৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন বীর মুক্তিযোদ্ধারা ফেনীকে পাকহানাদার মুক্ত করেছিল। দিনটিকে আমরা নানা উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করে থাকি। এ বছরও দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শোভাযাত্রা আলোচনা সভা ও পদযাত্রা। সেদিন ফেনীর বীর মুক্তিযোদ্ধারা যে অসামান্য বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন সেটিকে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করব।’