সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২৫ ১৫:৪৩ পিএম
বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার নলকূপগুলোতে পানি নেই। প্রবা ফটো
এবার বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই কিশোরগঞ্জ জেলা শহরসহ জেলার ১৩টি উপজেলায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনাবৃষ্টির কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অগভীর নলকূপসহ টিউবওয়েলগুলোতে পানি উঠছে না। এতে জেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে বৃষ্টি হলে সমস্যার সিংহভাগ সমাধান হয়ে যাবে।
ফলে হাসপাতাল, মসজিদসহ নানা প্রতিষ্ঠানে শত শত মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। নলকূপগুলতে পানি না উঠায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পানির অভাবে চিকিৎসা সেবা, অজু-গোসল, গবাদিপশু পালন ও সংসারের কাজকর্মও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। দীর্ঘ অনাবৃষ্টি, ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, অপরিকল্পিতভাবে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি তোলা ও পুকুর-খাল-বিল ভরাটের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা শহরের শোলাকিয়া, খরমপট্রি, গাইটাল, পুরানথানা, কাচারি বাজার, রথখলা, বয়লা, নগুয়া, হারুয়া, চরশোলাকিয়া, নিউটাউন, তারাপাশাসহ ৫০টি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার প্রায় দুই শতাধিক গভীর নলকূপ থেকে পানি উঠছে না। পরে জানা গেল পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পানি না উঠায় বিপাকে পড়েছে দুই শতাধিক পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ। ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকরা তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প কল বসিয়ে কিংবা পাইপ বসিয়ে আরও গভীরে নিয়ে নলকূপ চালু করার চেষ্টা করছে।
বত্রিশ বেসরকারি হাসপাতাল সিটি ল্যাবের পরিচালক মো. সাদেকুর রহমান জানান, হঠাৎ করে তাদের হাসপাতালের গভীর নলকূপ থেকে পানি উঠছে না। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তারা দ্রুত আরেকটি গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।
কাচারি বাজার জামে মসজিদে একই অবস্থা, গভীর নলকূপ থেকে পানি উঠছে না। ফলে সভাপতি জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খানের সহায়তায় পৌর পানির লাইনে সংযোগ দিয়ে অজু, গোসলের জন্য বিকল্প পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ সদর, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, বাজিতপুর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী, কুলিয়ারচরসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে হ্যান্ড টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। গত (ফেব্রুয়ারি) মাস থেকেই পানি ওঠা কমে যায়। আর মার্চ মাসের প্রথম থেকে এই সমস্যা তীব্র হতে শুরু করেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণত মাটির নিচে ৫০-৬০ ফুট গভীরে পানির স্তর স্বাভাবিক থাকে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় ওইসব এলাকায় পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলোও ক্রমেই শূন্য হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে গৃহস্থালির কাজে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বোরো চাষে পানির সংকটের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
করিমগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আল আমিন মিয়া জানান, ২৫ দিন ধরে বাড়ির নলকূপে পানি কম উঠছে। তাই বাধ্য হয়েই পানি সংগ্রহে বাড়ির নিকটবর্তী বোরো স্কিমের অগভীর শ্যালো মেশিনে যেতে হচ্ছে। আর এ অবস্থা শুধু আমাদের নয়, আশপাশের বাড়িতেও একেই অবস্থা।
বাজিতপুর উপজেলার পিপড়াদী গ্রামের গৃহবধূ তাসলিমা খাতুন বলেন, মানুষের কাছে হাত পেতে পানি আনতে হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে মোটর চালু করে কেউ পানি দিতে চাই না। বাড়ি বাড়ি ঘুরে রান্না জন্য এক কলসি পানি এনে কোনো রকমে চলছি।
পরিবেশ আন্দোলন জেলার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জুয়েল জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখেছেন, বেশিরভাগ খাল-বিল, পুকুর, জলাশয়, নদী-নালা ভরাট করে বহুতল ভবনসহ নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করা হচ্ছে। ফলে এসব ভবন ও স্থাপনার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোথাও নেই পানি। এতে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। গভীর কিছু নলকূপ দিয়ে কিছু পানি পাওয়া গেলেও সাধারণ পাম্পগুলো পানি তুলতে পারছে না। টিউবওয়েলগুলোর শতকরা ৮০টির পানি নেই।
জাতীয় নাগরিক কমিটি জেলার অন্যতম সাইফুল্লাহ সিদ্দিক হিমেল বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণে খোলা জায়গা ও জলাধার কমে যাওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে পানির এ সংকট দেখা দিয়েছে, যা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। এখনই সচেতন না হলে আগামীতে সমস্যা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। যে কারণে টিউবওয়েলগুলোতে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টি হলে সমস্যার সিংহভাগ সমাধান হয়ে যাবে। বিশুদ্ধ পানি সংকট সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।