অনাথ মন্ডল, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৫ ১৩:৪৪ পিএম
পূর্ব ধানখালী এলাকায় জমিতে ইঁদুর নিধনে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতছে কৃষক প্রিয়জিত মন্ডল। প্রবা ফটো
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় ইঁদুরের উপদ্রব থেকে ফসল রক্ষায় কৃষকদের মধ্যে জমিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতার প্রবণতা বাড়ছে। এই ফাঁদে পড়ে কৃষকের ফসল রক্ষাকারী ইঁদুরভোজী প্রাণী পেঁচা, শিয়াল, বেজি, সাপ, গুঁইসাপসহ বিভিন্ন প্রাণীও মারা যাচ্ছে। এ ছাড়াও ইঁদুর নিধনের এই মারণফাঁদে পড়ে অসাবধানতাবশত কৃষকসহ সাধারণ মানুষও মারা যাচ্ছে।
এমনকি পোল্ট্রি ফার্মের চারপাশে রাতে শিয়াল তাড়াতে বৈদ্যুতিক সংযোগ দিয়ে রাখছেন খামারমালিকরা। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আগের সময়ে ফসলের ক্ষেতে বৈদ্যুতিক সংযোগ দিয়ে ইঁদুর নিধন জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু বর্তমানে ক্ষেতে ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা নিরুপায় হয়েই অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন করে ইঁদুর নিধন করছেন।
বংশীপুর-মুন্সীগঞ্জ সড়কের ধানখালি এলাকায় ধানক্ষেতে জমির আইলে ইঁদুর মারার জন্য বৈদ্যুতিক ফাঁদ স্থাপন করছেন কৃষক প্রিয়জিত মন্ডল। অবৈধ এই মৃত্যুফাঁদ কেন পেতেছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘ইঁদুর নিধনে বিকল্প কিছুই কাজে আসে না। তাই বাধ্য হয়েই এটি করছি।’
মুন্সীগঞ্জ ধানখালী এলাকার কৃষক প্রিয়জিত মন্ডল একাই নন, উপজেলাজুড়ে প্রায় সব কৃষকই অবৈধ বৈদ্যুতিক এই মারণফাঁদ পেতে ইঁদুর নিধনের চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে একাধিক কৃষক বলেন, ‘এ বছর আগাম বৃষ্টি হওয়ায় ধানের ক্ষেতগুলো ঘন, সবুজ হয়ে উঠেছে। ভালো ফলনের আশায় কৃষকের চোখেমুখে আনন্দ ঝিলিক দিয়ে উঠছে। কিন্তু হঠাৎ করে ইঁদুরের আক্রমণে কৃষকরা হতচকিত ও হতাশ হয়ে পড়েছেন। দলবেঁধে ইঁদুর ধানের গাছ কেটে সাবাড় করছে। এতে জেলার কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও ইঁদুর মারতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে ইঁদুর নিধন করছেন।
গত বছর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর কদমতলা এলাকায় বোরো ধানক্ষেতে ইঁদুরের উপদ্রব ঠেকাতে পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শোকর আলী গাজী (৫৮) নামে এক কৃষক মারা যান। শোকর আলী গাজী গ্রামের মৃত মোবারক গাজীর ছেলে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে এমন মৃত্যুর খবর আরও পাওয়া গেছে।
শুধু এই ঘটনাই নয়, মাঝেমধ্যেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইঁদুর মারা বৈদ্যুতিক ফাঁদে মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ধান, গম, সবজিসহ বিভিন্ন ক্ষেতে কৃষকরা ইঁদুর ঠেকাতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই ফাঁদ বন্ধে সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে ইঁদুর মারার ফাঁদ এখন মানুষ মারার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। অবৈধ জেনেও কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন? এ ব্যাপারে প্রিয়জিত মন্ডল বলেন, ‘বিষটোপ, ইঁদুর নিধন ট্যাবলেট, পলিথিনের নিশানা আর কলাগাছ পুঁতেও কূলকিনারা না পেয়ে ‘বৈদ্যুতিক ফাঁদ’ পেতে তিনি ইঁদুর মারার চেষ্টা করছেন।’
ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ফাঁদের ব্যাপারে শ্যামনগর সরকারি মহসিন ডিগ্রী কলেজের কৃষি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. শেখ আফসার উদ্দিন বলেন, ‘ইঁদুরের উপদ্রব এড়াতে ফসলের মাঠে বৈদ্যুতিক ফাঁদ দেওয়া কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। কেননা, ইঁদুরের ফাঁদ নিমিষেই মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই ইঁদুরের উপদ্রব এড়াতে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। কৃষকদের ফসলের মাঠে বৈদ্যুতিক ফাঁদ দেওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, ‘বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা একেবারেই অবৈধ। বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহারে কৃষকের অনুমতি নেই। এরপরও নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এই ফাঁদ তৈরি করে ইঁদুর মারছে। এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।
উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সঞ্জিত কুমার মন্ডল বলেন, ‘গুনা তার ঝুলিয়ে তাতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কোনো অনুমতি নেই। এটা আইনের লঙ্ঘন। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রনী খাতুন বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এ ধরনের মারণফাঁদ তৈরি অত্যন্ত অনিরাপদ ও বিপজ্জনক। ইঁদুর নিধনের জন্য আরও কার্যকরী ও নিরাপদ পদ্ধতি উদ্ভাবনের কথা ভাবতে হবে এবং কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃষি বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।