রংপুরে মা-মেয়ে হত্যা
রংপুর অফিস
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২১:৫২ পিএম
আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২২:২৮ পিএম
গ্রেপ্তারকৃত আতিকুর রহমান।
রংপুরের পীরগঞ্জে নৃত্যশিল্পী দেলোয়ারা বেগম ঝিনুককে (৩৬) হত্যার দেড় মাস আগে তার ৫ বছরের কন্যাশিশু সায়মাকেও হত্যা করে লাশ মাটিতে পুঁতে রাখেন ঝিনুকের কথিত স্বামী আতিকুর রহমান (৩৫)।
আতিকুরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) পীরগঞ্জ পুলিশ আতিকুরের বাড়ির পেছনে গর্ত থেকে শিশু সায়মার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। এ সময় আতিকুল ইসলামের বসতবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এদিকে রবিবার গ্রেপ্তার আতিকুরকে আদালতে হাজির করে ৭ দিন রিমান্ডের আবেদন করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিলালপুর গ্রামের রেজাউল করিম তার স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম ঝিনুককে প্রায় তিন বছর আগে তালাক দেন। তারপর থেকেই ঝিনুক যাত্রাগানের ভাসমান শিল্পী হিসেবে জীবনযাপন শুরু করেন। মায়ের সঙ্গে তার ৫ বছরের শিশুকন্যা সায়মাও থাকত। এদিকে পীরগঞ্জের চতরা ইউনিয়নের বড় বদনাপাড়ার আতিকুর রহমান ঝিনুককে মাঝেমধ্যে যাত্রাগানের শিল্পী হিসেবে ভাড়া করে আনতেন। তারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবেও পরিচয় দিতেন।
গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা এলাকায় একটি মরিচ ক্ষেতে দেলোয়ারা বেগম ঝিনুকের মস্তকবিহীন মরদেহ দেখতে পায় স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে। এ সময় লাশের একটু দূরে কাপড়ভর্তি একটি ব্যাগে মোবাইল নম্বর লেখা কাগজ ও সিম উদ্ধার করা হয়। নাম-পরিচয়ের জন্য পুলিশের সিআইডি টিম ঘটনাস্থলে এসে দেলোয়ারা বেগমকে শনাক্ত করে এবং লাশ ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়।
ঝিনুকের লাশ উদ্ধারের পর থেকে তথ্য-প্রযুক্তির সাহায্যে আতিকুর রহমানের ওপর নজর রাখে পুলিশ। শনিবার সকালে কাবিলপুর ইউনিয়নের ঘনশ্যামপুর গ্রাম থেকে আতিকুর বোরকা পরে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশে জিজ্ঞাসাবাদে আতিকুর দেলোয়ারা বেগম ঝিনুককে হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং তাকে নিয়ে পীরগঞ্জের বড় বদনাপাড়া গ্রামের করতোয়া নদীর তীরে বালুর ভেতরে পুঁতে রাখা দেলোয়ারা বেগমের মস্তক উদ্ধার করে পুলিশ।
এ খবর জানাজানি হলে ঝিনুকের সাবেক স্বামী রেজাউল করিম পীরগঞ্জ থানার ওসিকে জানান, তার মেয়ে সায়মাও ঝিনুকের সঙ্গে থাকত। সেই শিশুটি কোথায়- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুলিশ আতিকুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি তাকেও হত্যা করেছেন বলে স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল রবিবার সকালে চতরা ইউনিয়নের বড় বদনাপাড়ার আতিকুরের বাড়ির পেছন থেকে শিশুটির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।
এদিকে মা ও মেয়েকে হত্যার ঘটনায় এসআই অনন্ত কুমার বর্মণ বাদী হয়ে আতিকুরকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।
এদিকে মা ও মেয়েকে হত্যার ঘটনায় স্থানীয়রা গতকাল দুপুরে বড় বদনাপাড়া গ্রামে আতিকুরের বাড়িতে যান। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় তারা আতিকুরের দ্রুত বিচার করে ফাঁসির দাবি জানান। খবর পেয়ে উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ততক্ষণে আতিকুল ইসলামের তিনটি টিনের ছাউনি ও বেড়া দেওয়া বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
বাড়িতে আতিকুরের মা আতিয়া বেগম (৫৫) ও তার ছোট ভাই নাজমুল ইসলামের স্ত্রী পিংকি (২৫) থাকতেন। তারা উভয়ে এখন থানা হেফাজতে রয়েছেন। নাজমুল বিদেশে থাকেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ ফারুক বলেন, আতিকুর রহমানের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী শুক্রবার ওই নারীর মস্তক উদ্ধার করা হয়। রাতে জিজ্ঞাসাবাদে দোলোয়ারা বেগমের শিশুকন্যাকে দেড় মাস আগে হত্যা করে পুঁতে রাখার কথা স্বীকার করেন তিনি। আজ (রবিবার) আতিকুরের বাড়ির পাশের সুপারি বাগান থেকে শিশু সায়মার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। শুনেছি বিক্ষুব্ধ জনতা আতিকুরের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ঝিনুকের সাবেক স্বামী রেজাউল আমাদের কাছে তার শিশুকন্যা সায়মার খোঁজ জানতে চাইলে আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে শিশুটিরও লাশ পাই। দুটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে তদন্ত চলছে। আতিকুরের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। শিশুটির লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এদিকে ময়নাতদন্তের পর স্বজনরা ঝিনুকের লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশের উদ্যোগে শনিবার রাতে রংপুর শহরের মুন্সিপাড়া সরকারি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।