বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:১১ এএম
ফাইল ফটো
চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় ভ্যানে করে আম বিক্রি করতেন আবুল বশর। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন তিনি। আমসহ ভ্যানগাড়িটিও খোয়ান তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ দুই মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর বর্তমানে বিবিরহাট এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় আছেন তিনি। পা পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। ক্রাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। এ অবস্থায় বশর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন পুনর্বাসনের আশায়।
নিজের অসহায়ত্ব আর হতাশার কথা তুলে ধরে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে আবুল বশর বলেন, ‘আহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসার সব পুঁজি হারিয়েছি। সরকারি চিকিৎসাটা পেয়েছি। এর বাইরে কোনো সহযোগিতা পাইনি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ কেউ সহযোগিতা করেছেন। সেটা দিয়ে ওষুধ, সংসার খরচ সব তো চলে না। তাদের কাছে বারবার চাইতেও লজ্জা লাগে।’
তিনি বলেন, ‘দুই সন্তান, স্ত্রী ও মাকে নিয়ে আমার সংসার। সংসারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলতে একমাত্র আমিই ছিলাম। আমার চাওয়া রুটি-রুজির একটা ব্যবস্থা। এজন্য সিভিল সার্জন কার্যালয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) হেড অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং সমন্বয়কদের কাছে ঘুরেছি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস পাচ্ছি না। সবাই বলছে একটা তালিকা হচ্ছে সহযোগিতা পাব। কিন্তু কখন কীভাবে পাব সেই উত্তর কেউ দেয় না। সমন্বয়কদের কল, মেসেজ দিলে উত্তরও দেয় না। একটা অটো বা ভ্যান হলে জীবন আর সংসারটা চালিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু কোথাও থেকে সাড়া পাচ্ছি না।’
আবুল বশর তবু চিকিৎসাটুকু পেয়েছেন। আন্দোলনে আহতদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা চিকিৎসাও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তাদের। এর পেছনে অবশ্য পদ্ধতিগত নানা জটিলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতদের নিয়ে কাজ করছে ‘জুলাই শহীদ ও আহত ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন। এর একজন প্রতিনিধি ফারহান জামিল। তিনি নিজেও ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর নিউমার্কেট এলাকায় আহত হন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে ফারহান জামিল বলেন, ‘অনেকের ভেরিফিকেশন হয়নি। আহতদের তথ্য সংগ্রহের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা অনুযায়ী নিজ নিজ জেলায় তাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সেখান থেকে ভেরিফিকেশন নেওয়ার একটা ব্যাপার আছে। গত দুদিন আমি সিভিল সার্জন কার্যালয়ে গিয়ে অনেককে তালিকাভুক্ত করেছি।’
আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতার অভাব আছে বলে মনে করছেন আহতদের অনেকে। তাদের একজন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ এমদাদ। ৫ আগস্ট কাজীর দেউড়িতে চোখে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। দুটি অপারেশনের পর এখন ডান চোখে দেখতে পাচ্ছেন না তিনি।
সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ এমদাদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে আমাকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে সিএমএইচে। দুটি অপারেশন হয়েছে। তবে ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। এসবের বাইরে প্রাইভেটেও আমাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ওই খরচটা নিজে বহন করেছি। কিন্তু সেগুলোর জন্য কিংবা পুনর্বাসনের জন্য কোনো সহযোগিতা এখন পর্যন্ত আমি পাইনি। অনেকেই পায়নি।’
তিনি বলেন, ‘সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক বাঁশখালীর করিম মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হন। বিদ্ধ হওয়া বুলেট মেরুদণ্ডেই থেকে গেছে। সব মিলিয়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অব্যবস্থাপনা আছে, অনেকের আন্তরিকতারও অভাব আছে। আমরা তো প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখাও করেছি। এরপর ঢাকার আন্দোলনে চার-পাঁচজন উপদেষ্টা রাস্তায় এসে আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতের বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে গেছেন। তারপরও বলার মতো সুরাহা হয়নি।’
চট্টগ্রামে আহতদের তালিকা প্রস্তুত করছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। সেই তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ওই তালিকা ধরেই সরকারি সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার শাহীদ ইসরাক বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৫২৭ জন আহত ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আরও অনেক আবেদন আছে। যাচাই-বাছাই শেষে সেগুলো তালিকাভুক্ত করা হবে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য আহতদের বিভিন্ন সময়ে কিছু কিছু সহযোগিতা করা হয়েছিল। তবে সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা এখনও আসেনি। কিছু দিনের মধ্যে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে কিছু সহযোগিতা করা হবে। তার প্রক্রিয়া চলছে।’
এর বাইরে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে আহতদের পুনর্বাসনের জন্য এক লাখ টাকা করে নগদ দেওয়া হচ্ছে। কতজন আহত সেই সহযোগিতা পেয়েছেনÑ তা জানতে চাইলে চট্টগ্রামের আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বে থাকা সমন্বয়ক এনামুল হক বলেন, ‘জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে শতাধিক আহত ব্যক্তিকে এক লাখ করে টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে বেশিরভাগই এখনও পুনর্বাসনের আওতায় আসেনি। অনেককে চিকিৎসা খরচ বাবদ টাকা দেওয়া হচ্ছে।’