হাসান সিকদার, টাঙ্গাইল
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৫৯ এএম
টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে অবাধে চলছে তামাক চাষ। তামাক চাষে কৃষকদের প্রলুব্ধ করছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। শুক্রবার সদর উপজেলার মৈশানন্দলাল গ্রামে। প্রবা ফটো
টাঙ্গাইলের যমুনার চরে কৃষকরা লাভের ফাঁদে পড়ে তামাক চাষ করছেন। বেশি লাভ হবে তাই এতে ঝুঁকছেন চাষিরা।
এ কাজে নিয়োজিত আছে বহুজাতিক টোব্যাকো কোম্পানি। তারাই ধান ছেড়ে চাষিদেরকে তামাক চাষের ঘেরাটোপে ফেলেছে। অনেক বেশি লাভের কথা বলে তামাক চাষে প্রলুব্ধ করছে। ফলে কৃষকরা সাতপাঁচ না ভেবে বহুজাতিক কোম্পানির কথায় সায় দিয়ে দিন দিন তামাক চাষ বাড়িয়ে তুলেছে। অথচ যমুনার চরে একটা সময় চাষ হতো ধানসহ নানা ধরনের ফসল। নব্বইয়ের দশকে নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে যায় চরের বেশিরভাগ ফসলি জমি। বাঁধ নির্মাণের ফলে যমুনার ভাঙন অনেকটাই কমেছে। দুই বছর আগে আবারও জেগে উঠেছে চর। তবে আবাদি জমি ফিরে পেলেও ধান চাষে ফিরে যাননি চরাঞ্চলের কৃষকরা। তারা তামাক চাষেই ব্যস্ত।
টাঙ্গাইলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় পাঁচটি উপজেলায় এবার ২৩৩ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ভূঞাপুরে ১১৫ হেক্টর, কালিহাতীতে ৯০ হেক্টর, নাগরপুরে ৭ হেক্টর, দেলদুয়ারে ৩ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ১৮ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবহারের ফলে মুখে ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি হয়ে ব্রেনস্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক হওয়ার মতো ঝুঁকি বাড়ায় এবং পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও মাটির গুণাগুণ মারাত্মক ক্ষতি করে। এটা জেনেও শুধু বেশি লাভের ফাঁদে পড়ে তামাক চাষ করছেন কৃষকরা। তামাক চাষে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার করায় নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরতা। এতে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ হুমকির মুখে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, জাপান টোব্যাকো, আবুল খায়ের টোব্যাকো, বেঙ্গল টোব্যাকো, গ্লোবাল টোব্যাকো, তারা টোব্যাকো- এইসব প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব প্রতিনিধির মাধ্যমে জেলার স্থানীয় কৃষকদেরকে বেশি লাভ দেখিয়ে তামাক চাষে উৎসাহী করেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। তামাক চাষের আগে ও পরে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়। উৎপাদিত পণ্য অন্য পণ্য থেকে বেশি দামেও কিনে নিচ্ছে। এই নানান সুযোগ-সুবিধা হাত ছাড়া করছেন না কৃষকরা। কিন্তু তামাক চাষে যে যথেষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে তা জেনেও কৃষকরা নিবৃত্ত নয়, বরং বিপুল উৎসাহ নিয়ে তামাক চাষ করছে।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে তামাকজাতীয় ফসল উৎপাদন ও চাষ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে এ আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন অনেক। কোথাও এর প্রয়োগ দেখা যায় না।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী, নলশা, জগৎপুরা, বামনহাটা, চর নিকলা, নিকরাইল, পালিমা, আমুলা, টাঙ্গাইল সদরের কাকুয়া, হুগড়া, কাতুলী, মামুদ নগর, চর পৌলী, কালিহাতী উপজেলার সল্লা, দেউপুর, চর হামজানী, কদিম হামজানী, পটল, বেরী পটল, জোকারচর, গোহালিয়াবাড়ী, কুর্শাবেনু, সলিল গোবিন্দপুর, আফজালপুর ধলাটেঙ্গর, দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটি, নাগরপুরের পাকুটিয়া, ভাদ্রা, বেকরা, আটাপাড়া, সলিমাবাদ, ধুবুরিয়া, মোকনা, বনগ্রাম, শাহজানী প্রভৃতি অঞ্চলে মাঠের পর মাঠ তামাক চাষ করা হচ্ছে। জেলায় সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ হচ্ছে কালিহাতী ও ভূঞাপুর উপজেলায়। শুধু এ চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতেই কয়েক হাজার একর ফসলি জমিতে তামাক চাষ করা হচ্ছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, বহুজাতিক কোম্পানির অশুভ তৎপরতা, বিক্রির নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, কৃষকদের কাছে এসে কোম্পানির লোকদের ঘুরঘুর করা ও চাষিদের নানা পরামর্শ দিয়ে যাওয়া, এসব কারণই তামাক চাষের প্রসার ঘটিয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেন, তামাক সেবন যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনই তামাক চাষও ক্ষতিকর। টাঙ্গাইলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, কোম্পানির লোভের ফাঁদে পা দিয়ে বেশি লাভের আশায় তামাক চাষ করছে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।