সাতক্ষীরা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১৮:০১ পিএম
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১৮:১০ পিএম
‘চাই না মাগো রাজা হতে, রাজা হবার সাধ নাই, মাগো দুবেলা যেন পাই মা খেতে’Ñ অষ্টাদশ শতাব্দীর বাঙালি কবি ও সাধক রামপ্রসাদ সেনের গানের এ চরণ; প্রকৃত অর্থেই সাধারণ বাঙালির চিরন্তন স্বপ্ন। বাঙালির ভাতের কষ্ট, পেটের টানের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও অভাবের তাড়নায় ভাতের অভাবে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকা, সন্তানকে অন্যের বাসা থেকে ভাতের মাড় নিয়ে খাওয়ানোর গল্প অবাস্তব কিংবা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা এটাই। এ সময় একমুঠো ভাতের অভাবে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে ৬ বছর বয়সি শিশুসন্তান আফসানা খাতুন আঁখির মুখে ভাতের মাড় তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছে শিশুটির পরিবার। আফসানার বাড়ি আশাশুনি উপজেলার বাঁকড়া ব্রিজ এলাকায়। সে ওই এলাকার আলমগীর হোসেন ও রুবিনা খাতুন দম্পত্তির একমাত্র সন্তান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত এক দশক আগেও ভাতের অভাব ছিল না এ পরিবারে। বসবাস করত মরিচ্চাপ নদীর তীরে। তবে একটা সময় নদীগর্ভে বিলীন হয় আলমগীর হোসেনের বসতভিটা। এরপর যাযাবরের মতো বিভিন্ন ইটভাটা ও রাইস মিলে পরিবারসহ কাজ করে সংসারের ভরণপোষণ জোগাতেন তিনি। তবে শারীরিক অক্ষমতার কারণে মালিকপক্ষের মনমতো কাজ করতে না পারায় সেখান থেকে বিতাড়িত হতে হয় আলমগীরকে। একপর্যায়ে উপায়ন্তর না পেয়ে বাঁকড়া ব্রিজের বেড়িবাঁধের স্লোপে (পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা) বেড়া আর নারকেল গাছের পাতার ছাউনি দিয়ে বসবাস শুরু করে আলমগীর ও রুবিনা দম্পতি। এরই মধ্যে জন্ম হয় শিশু আফসানা খাতুন আঁখির।
আঁখির বয়স যত বাড়তে থাকে খরচও বাড়তে থাকে আলমগীরের সংসারে। তবে ভারী কাজ করতে অক্ষম হওয়ায় বছরের অধিকাংশ সময় বেকার থাকতে হয় আলমগীরকে। রুবিনা কাজ করলেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। এ ছাড়াও প্রত্যন্ত অঞ্চল বিধায় সব সময় কাজ না পাওয়ায় দুরবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এ পরিবারে।
সরেজমিনে আঁখিদের এলাকায় গেলে জানা যায়, বর্তমানে ওই এলাকার বিদ্যুৎহীন পরিবার তারা। বছরের অধিকাংশ সময় কোনো না কোনো বেলা অনাহারে থাকতে হয় তাদের। এনজিওর সহায়তায় আঁখির বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ থাকলেও সেটার আলো হিসেব করে ব্যবহার করতে হয়। যদি আকাশ দীর্ঘদিন মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে অন্ধকারে থাকতে হয় রাতের সময়। আর রাতের মতোই অন্ধকার নেমে এসেছে তাদের জীবনে।
শিশু আঁখির বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পার্শ্ববর্তী একটা বাড়ি থেকে মেয়ের জন্য ভাতের মাড় সংগ্রহ করে রেখেছেন মা রুবিনা খাতুন। দুপুরের পর যখন আঁখি ৩ কিলোমিটার দূরের স্কুল থেকে ক্লাস শেষ করে ফিরবে, তখন এই ভাতের মাড় খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করবে শিশুটি। এ ছাড়াও শিশুটির খাবারের তালিকায় ছিল টমেটো সিদ্ধ ও দেশি পুঁটি মাছ ভাজা। বর্তমানে সবজির দাম কম থাকায় টমেটো কিনেন আঁখির বাবা। আর মাছগুলো প্রতিবেশী এক ঘের মালিকের দেওয়া।
আঁখির মা রুবিনা খাতুন জানান, অনেক কষ্টের ভেতরে রয়েছেন তিনিসহ তার পরিবার। অভাবে অভাবে এখন বেঁচে থাকাটাই কষ্টের। রুবিনার ভাষায়, নসিবে যদি কষ্ট লেখা থাকে, তাহলে সুখ আসবে কোথা থেকে! স্বামী অসুস্থ, ভারী কাজ করতে পারে না। এক দিন কাজ বয়লে (চললে) দুই দিন কাজ হয় না। আমি তো নারী। আমারে সবাই কাজেও নেয় না। যারা নেয় তারাও কম মজুরি দেয়। বর্তমান বাজারে এক-দেড়শ টাকায় কি সংসার চলে, প্রশ্ন রাখেন রুবিনা।
রুবিনা বলেন, মেয়েটারে নতুন জামা দিতে পারি না। মানুষের দেওয়া পুরান জামায় দিন কাটে। ফুল ড্রেসের বদলে হাফ প্যান্ট পরে আঁখিরে ক্লাসে পাঠাই, এতে স্যাররা আপত্তি তুলেছে। যেখানে একমুঠো ভাত জোগাড় করতে পারি না, সেখানে ফুল প্যান্ট কিনব কোত্থেকে।
আঁখির বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, জীবনে সুখ কী জিনিস সেটাই জানি না। আওয়ামী লীগ সরকার ভূমিহীনদের ঘর দিয়েছিল। আমাদের ভাগ্যে ঘর জোটেনি। আবেদন করেছিলাম। সরাসরি তৎকালীন ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেও লাভ হয়নি। ৫ বছরের মতো বেড়িবাঁধের স্লোপে বসবাস করছি। এখানে কর্মসংস্থানের অভাব। যে কাজ পাই তাতে শরীর কুলায় না।
তিনি আরও বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এখান থেকে আমাদের চলে যেতে বলেছে। এখান থেকে গিয়ে থাকব কোথায়? এ সময় নিজ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সমাজের মানবিক ব্যক্তিসহ রাষ্ট্রের প্রতি অনুরোধ জানান এ ব্যক্তি।
সাতক্ষীরার উন্নয়নকর্মী মাধব দত্ত বলেন, আফসানা আঁখি আমাদেরই সমাজে বেড়ে ওঠা সন্তান, তার ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে, উন্নয়ন সংগঠন, প্রশাসন ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়ই এই পরিবারের সহায়তা করবে। বর্তমান সময়ে আঁখিদের মতো ভূমি ও গৃহহীন পরিবার থাকতে পারে না। বিত্তবানরা পরিবারটির পাশে দাঁড়াবে প্রত্যাশা করি।