অরক্ষিত রেল ক্রসিং
মোহন আখন্দ, বগুড়া
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:২১ এএম
আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:০৫ এএম
বগুড়া শহরে কামারগাড়ি এলাকায় সরকারি আজিজুল হক কলেজের সামনে লেভেল ক্রসিং। প্রবা ফটো
উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ বগুড়ায় শহরসংলগ্ন এলাকা ও গ্রামে পাকা সড়কের সংখ্যা যত বাড়ছে অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যাও তত বাড়ছে। মারণফাঁদ হয়ে উঠছে অনুমোদিত কিন্তু গেটম্যানবিহীন (প্রহরী ছাড়া) লেভেল ক্রসিংগুলো।
বগুড়ায় মিটারগেজ সেকশনের ৭০ কিলোমিটার রেলপথে ২১টি অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এ ছাড়া অনুমোদন রয়েছে কিন্তু গেটম্যান নেই এমন লেভেল ক্রসিং রয়েছে আরও ১০টি। এসব লেভেল ক্রসিং যেন মারণফাঁদ হয়ে উঠেছে। এসব ক্রসিং পার হতে গিয়ে দিনে-রাতে ট্রেনে কাটা পড়ে একের পর এক ঘটে চলেছে প্রাণহানি। তারপরও রেলওয়ে এবং রেললাইন অতিক্রম করা সড়কগুলোর তদারক সংস্থা এলজিইডি, পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বিকার।
রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, সান্তাহার জংশন স্টেশন থেকে সোনাতলা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথে মোট ৫১টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি রেলওয়ের প্রকৌশল শাখার অধীনে। বাকি ২১টি রেলওয়ে ট্রাফিক বিভাগের নিয়ন্ত্রণে।
ওইসব লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ‘স্পেশাল’ ক্যাটাগরির ৫টিসহ ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির মোট ১৮টিতে গেটম্যান রয়েছে। বাকি ৩৩টির মধ্যে ১০টিতে গেটম্যান নেই। এর পাশাপাশি শহর ও গ্রাম এলাকায় পাকা সড়ক সম্প্রসারণের কারণে আরও অন্তত ২১টি স্থানে অনুমোদন ছাড়াই লেভেল ক্রসিং গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ১৩টির অবস্থান এলজিইডির মালিকানাধীন কাঁচা-পাকা সড়কে।
বগুড়ার সান্তাহার রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে সোনাতলা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার রেলপথ দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ১৪টি ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন গড়ে দেড় ঘণ্টা পর একটি ট্রেন চলাচল করে। এ কারণে লেভেল ক্রসিংগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
গেটম্যানবিহীন অননুমোদিত ক্রসিংয়ে যানবাহন পারাপার হতে গিয়ে হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরও।
২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বগুড়ার সান্তাহার থেকে সোনাতলা স্টেশন পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার রেলপথ ক্রসিংয়ে পাঁচজন নিহত হয়। এর আগের বছরগুলোতে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ১নং ফটকসংলগ্ন অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংয়ে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনুমোদন রয়েছে কিন্তু গেটম্যান নেই এমন লেভেল ক্রসিংয়ে শুধু একটি ‘সতর্কবাণী সাইনবোর্ড’ টাঙিয়ে দায় সারছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কর্মকর্তাদের ভাষ্যÑ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কিছুই করার নেই। আবার এসব ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার দায় নিতেও নারাজ তারা। কারণ হিসেবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী রেললাইনের ওপর দিয়ে যে সংস্থার (এলজিইডি, পৌরসভা কিংবা সওজ) সড়ক যাবে লেভেল ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার (প্রতিবন্ধক) নির্মাণের যাবতীয় ব্যয়ভার সেই সংস্থাকেই বহন করতে হবে। রেলওয়ে কেবল তাদের ক্রসিংগুলোতে ব্যারিয়ার নির্মাণের তাগাদা দিতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের কামারগাড়ি এলাকায় সরকারি আজিজুল হক কলেজের ১নং ফটকের সামনে লেভেল ক্রসিংটি পুরোপুরি অরক্ষিত। অনুমোদন ছাড়াই লেভেল ক্রসিং গড়ে ওঠায় এখানে যাত্রী বিশেষত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপদ চলাচলের ক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো তৎপরতা নেই।
ওই কলেজের শিক্ষার্থী আবুল হোসেন জানান, কলেজে ক্লাস চলাকালে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত অন্তত ১০টি ট্রেন চলাচল করে। কিন্তু ওই লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেট বা ব্যারিয়ার না থাকায় জীবন হাতে নিয়ে চলতে হয়। আবীর হাসান নামে অপর এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘একটু অন্যমনস্ক হলেই মৃত্যু। বিগত বছরগুলোতে এভাবে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে।’
ওই কলেজ ক্যাম্পাসে বাদাম বিক্রেতা আশরাফুল ইসলাম জানান, শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে ওখানে আপাতত বাঁশ দিয়ে একটি অস্থায়ী গেট নির্মাণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংগুলোতে ব্যারিয়ার নির্মাণের জন্য সর্বশেষ ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে রেলওয়ের প্রকৌশল শাখা সড়কের তদারক সংস্থা এলজিইডি ও পৌরসভার সঙ্গে যৌথ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করে। তারপর আড়াই বছর কেটে গেলেও ওইসব অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো প্রতিবন্ধক নির্মাণ করা হয়নি। কবে নাগাদ হবে সেটাও কোনো পক্ষ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি।
একই অবস্থা অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রেও। কবে নাগাদ জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে সে ব্যাপারে রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তাই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংগুলোতে ব্যারিয়ার বা প্রতিবন্ধক নির্মাণে নতুন করে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে বগুড়া রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) আফজাল হোসেন বলেন, ‘২০২২ সালে যৌথ তদন্তের আলোকে আমরা এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছি। কিন্তু তারপর ওইসব প্রতিষ্ঠানের আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এক দশক আগে বগুড়া শহরের সাবগ্রাম এলাকায় অন্তত ৫টি অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার নির্মাণ করা হয়।’
রেলওয়ের তাগাদা সত্ত্বেও লেভেল ক্রসিংগুলোতে ব্যারিয়ার নির্মাণে সাড়া না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে এলজিইডি বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী ইউনুস হোসেন বিশ্বাস বলেন, ‘আমি বগুড়ায় নতুন এসেছি। তবে যেটুকু জানি যে, ২০২২ সালে যৌথ তদন্ত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী হেড অফিস থেকে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা। তবে এখন পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’
অনুমোদন থাকার পরও ১০টি লেভেল ক্রসিংয়ে জনবল নিয়োগে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে বগুড়ায় রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন করেছি। সর্বশেষ চার মাস আগেও আমরা লিখেছি। আশা করি, খুব শিগগির এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’