গ্রাম-বাংলা
শিশির খাঁন, সদরপুর-চরভদ্রাসন (ফরিদপুর)
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:৪২ পিএম
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণপুর গ্রামে খেজুর রস জ্বাল দিয়ে চলছে গুড় তৈরির কাজ। প্রবা ফটো
কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস সংগ্রহে বেরিয়ে পড়েন গাছিরা। গাছ থেকে নামিয়ে আনেন রস ভর্তি হাঁড়ি। এরপর তা নিয়ে ছোটেন চুলার কাছে। টিনের বড় পাত্রে রস ঢেলে জ্বাল দিয়ে শুরু হয় গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। আস্তে আস্তে রস শুকিয়ে রূপ নেয় সুস্বাদু গুড়ে।
একটা সময় শীত এলেই দেশের নানা প্রান্তের গ্রামগুলোর দৈনন্দিন দৃশ্য ছিল এমনটাই। কালের বিবর্তনে খেজুরগাছ কমে যাওয়া এবং এ সংশ্লিষ্টদের পেশা বদলের কারণে গুড় তৈরির এ মহাযজ্ঞ অনেকটাই কমে গেছে। তবু বিভিন্ন স্থানে এখনও দেখা যায় গুড় তৈরির কাজ। যার মধ্যে অন্যতম ফরিদপুরের কয়েকটি গ্রাম।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফরিদপুর জেলার সদরপুর ও চরভদ্রাসনে গ্রামীণ জনপদে থাকা খেজুরগাছের সুস্বাদু রস সংগ্রহ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। চলতি বছর ফরিদপুরে অন্তত ১০ হাজার খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের কাজ করছেন সহস্রাধিক গাছি। ফরিদপুরে এক হাঁড়ি রস ৫০০ টাকা ও এক কেজি গুড় ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রামীণ জনপদে থাকা খেজুরগাছের সুস্বাদু রস সংগ্রহ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। ঝুঁকি নিয়ে ৩০ থেকে ৪০ ফুট লম্বা খেজুরগাছে উঠে রস সংগ্রহ করে বাড়িতে আনছেন। পরে সেই রস জ্বালিয়ে সুস্বাদু পাটালি গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি শুরু করেছেন। দামও পাচ্ছেন ভালো।
গাছিরা বলেন, আগের দিন বিকালে গাছ কেটে হাঁড়ি বসানো হয়। পরের দিন ভোরবেলা রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। উৎপাদিত গুড় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি স্থানীয়দের কাছেও বিক্রি করা হয়।
রাজশাহী থেকে ফরিদপুরে আসা গাছি শেখ শরীফ বলেন, এই এলাকায় অন্তত শতাধিক খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করছি। শীতের প্রথম থেকেই আমরা দুজন রস সংগ্রহের কাজে যুক্ত আছি। অনেক কষ্ট হয় খেজুরের রস সংগ্রহ করতে। তবে দাম ভালো হওয়ায় কষ্ট আর গায়ে লাগে না। শীত মৌসুমে এই কাজ করে ছয় মাস স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে পারব।
গুড় ক্রেতা মুন্সি আলিমুজ্জামান বলেন, এখনকার সময়ে ভেজালমুক্ত জিনিস পাওয়াই দুষ্কর। খোঁজ পেলাম এখানে ভেজালমুক্ত রস ও গুড় তৈরি হয়, তাই নেওয়ার জন্য গাছি ও উৎপাদনকারীদের কাছে ছুটে আসা।
খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিজ উদ্যোগে ৬শ গাছ কিনেছেন তরুণ উদ্যোক্তা এনামুল হাসান গিয়াস। তিনি বলেন, রাজশাহী ও যশোরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গাছিদের আনতে হয়। এতে খরচ অনেকটা বেড়ে যায়, তাছাড়া খেজুর গাছে ওঠার ঝুঁকি বেশি থাকায় দিন দিন গাছির সংকট দেখা দিচ্ছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, নতুন করে খেজুরগাছ লাগানোর পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। ফরিদপুরে ছোট-বড় দেড় লাখের বেশি খেজুরগাছ রয়েছে।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশের অনেক জায়গাতেই ভেজাল গুড় তৈরি হয়। তবে ফরিদপুরের তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ প্রবণতা নেই। তাই খেজুরগাছ লাগানোর পাশাপাশি তাদের নানা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।