জাহাজে ৭ খুন
কুমিল্লা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৬:৪৯ পিএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৬:৫০ পিএম
জাহাজে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার কর্মচারী আকাশ মণ্ডল ইরফান।
চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে জাহাজে সাত খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার জাহাজের কর্মচারী আকাশ মণ্ডল ইরফান একাই চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে জানিয়েছে র্যাব।
বাহিনীটির দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আকাশ মণ্ডল ইরফান জানিয়েছেন— তিনি ক্ষোভ থেকে প্রথমে জাহাজের মাস্টার গোলাম কিবরিয়াকে কুপিয়ে হত্যা করেন। ঘটনা জানাজানি হওয়ার ভয়ে জাহাজের বাকি সাতজনকেও কোপান; যাদের মধ্যে ছয়জনই মারা গেছেন। অপরজন গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আকাশ মণ্ডলকে গ্রেপ্তারের পর বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে র্যাবের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। কুমিল্লা নগরের শাকতলা এলাকায় র্যাব-১১-এর সিপিসি-২ কুমিল্লা কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিং হয়।
ব্রিফিংয়ে র্যাব-১১-এর উপ–অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন জানান, নিয়মিত বেতন-ভাতা ও ছুটি না পাওয়ার জেরে এমভি আল-বাখেরা জাহাজের মাস্টারের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিলেন আকাশ। ঘটনার সময় খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে প্রথমে মাস্টারকে হত্যা করেন তিনি।
র্যাব জানায়, এরপর ধরা পড়ার ভয়ে জাহাজে থাকা বাকি সবাইকে হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং অন্য সাতজনকে আঘাত করেন। এর মধ্যে একজন বেঁচে যান।
গত সোমবার বিকালের দিকে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার মেঘনা নদীতে এমভি আল-বাখেরা থেকে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় গুরুতর আহত আরও তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আরও দুই জনকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার রাতে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র্যাব-১১ ও র্যাব-৬ যৌথ অভিযান চালিয়ে বাগেরহাটের চিতলমারি থেকে আকাশকে গ্রেপ্তার করে। তিনি বাগেরহাটের ফকিরহাট এলাকার জগদীশ মণ্ডলের ছেলে। তিনি জাহাজটিতে প্রায় ৮ মাস ধরে লস্কর পদে কর্মরত ছিলেন।
গ্রেপ্তারের সময় আকাশের কাছ থেকে একটি হ্যান্ড গ্লাভস, একটি ব্যাগ, ঘুমের ওষুধের খালি পাতা, নিহত ব্যক্তিদের ব্যবহৃত পাঁচটি ও আকাশের ব্যবহৃত দুটিসহ মোট সাতটি মুঠোফোন এবং বিভিন্ন জায়গায় রক্ত মাখানো নীল রঙের একটি জিনস প্যান্ট উদ্ধার করা হয়। ঘটনার সময় ওই জিনস প্যান্ট পরেছিলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন জানান, চাঞ্চল্যকর সাত খুনের এ ঘটনায় জাহাজের মালিক মাহবুব মোর্শেদ বাদী হয়ে চাঁদপুরের হাইমচর থানায় একটি মামলা করেন। তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তায় গতকাল রাতে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আকাশ মণ্ডল ওরফে ইরফানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য দেন বলে জানিয়ে র্যাব।
আসামি আকাশ মণ্ডলের জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে র্যাব জানায়, আকাশ মণ্ডল প্রায় আট মাস ধরে এই জাহাজে চাকরি করছেন। জাহাজের কর্মচারীরা ছুটি ও বেতন-বোনাস সময়মতো পেতেন না। বিভিন্ন ধরনের বিল কর্মচারীদের না দিয়ে জাহাজের মাস্টার গোলাম কিবরিয়া একাই ভোগ করতেন। এ ছাড়া জাহাজের মাস্টার কর্মচারীদের সঙ্গে রাগারাগি করতেন। কারও ওপর নাখোশ হলে তাঁকে জাহাজ থেকে নামিয়ে দিতেন। তাদের বকেয়া বেতনও দিতেন না।
এসব নিয়ে মাস্টারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। একপর্যায়ে জাহাজের মাস্টারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আকাশ। সে অনুযায়ী ১৮ ডিসেম্বর আকাশ তিন পাতা ঘুমের ওষুধ কিনে নিজের কাছে রেখে দেন। ২২ ডিসেম্বর সকাল আটটায় তারা মোট ৯ জন জাহাজে ৭২০ টন ইউরিয়া সার নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। ওই রাতে খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে প্রথমে তিনি মাস্টারকে হত্যা করেন। পরে একে একে অন্যদের কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন।
র্যাব আরও জানায়, সোমবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে সব জাহাজ তাদের গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেলে আকাশ নিজে জাহাজ চালাতে থাকেন। জাহাজটি একপর্যায়ে ইশানবালা খালের মুখে মাঝিরচরে আটকা পড়ে। তিনি জাহাজটি নোঙর করে পাশ দিয়ে যাওয়া ট্রলারে বাজার করার কথা বলে উঠে পালিয়ে যান।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলা হয়, আকাশকে হাইমচর থানায় হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে।